আমার জন্ম এক অজপাড়াগাঁয়ে। আমাদের বাড়িটা মুসলিম পরিবার পরিবেষ্টিত। আশেপাশের বাড়িগুলোর মধ্যে আমাদের বাড়িতেই টিউবওয়েল ছিল। তাই রমজান মাস তো বটেই, সারাবছরই প্রতিবেশী জেঠিমা, কাকিমা, বৌদিদের প্রতিদিনই কমপক্ষে একবার আমাদের বাড়িতে আসতেই হতো। জল নিতে আসা মানে তো শুধু জল নিতে আসা না, আমার মা-কাকিমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে যাওয়াও তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।
মাকে জেঠিমারা আমার বড়দির নাম ধরে বলতেন শিউলীর মা। আমাদের গ্রামের বাড়ির ঘর-দুয়ার ছিল খোলামেলা। মা-কাকিমা’র সাথে প্রতিবেশী কাকিমা-জেঠিমা, বৌদিদের যে আলাপ হতো, সেগুলো আমাদের কানেও এসে পৌঁছাত। কোনো গোপন কথা থাকলে, দুই-পক্ষই একটু গলা নামিয়ে কথা বলতেন।
এখনও শুনতে পাই, “ঘরে কি আর কিছু আছে? দুটো চাল মুখি দিয়ে পানি খেইয়ে রোজা ভাঙলাম। শিউলীর মা কাল তুই যে অমুক ফলটা দিছিলি, সেইটে দিয়ে আইজ ইফতার করলাম।”
তখনও ইফতার, রোজা ভাঙা এগুলো সেভাবে বুঝে উঠতে শিখিনি। ঠিক পাশের বাড়ির এক জেঠিমা একদিন মাকে বলছেন, “আল্লাহ যেমন এই মাসে আমাদের সংযম করতি বলেছেন, তেমনি ইফতারিতে, সেহরিতে ভালো খাবার, একটু দামি খাবার খাতিও নিষেধ করেননি। তবে খাবারটা হালাল হতি হবে।”
সেই প্রতিবেশী জেঠিমার এই বক্তব্য নিয়ে এখন নানান মতামত মিলবে আমি জানি। কিন্তু আমার বক্তব্য অন্য জায়গায়, ওই জেঠিমাদের পরিবারের একটু ভালো বা দামি খাবার কেনার সাধ্য তো দূরের কথা, সেদিকে তাকানোর সাহসও তখন ছিল না।

ইফতার পার্টি কাকে বলে তখনও আমরা বুঝতে শিখিনি। তবে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মসজিদে পুরুষদের একসাথে ইফতার করতে দেখেছি, সেই ইফতারের যে খাবার সেটাও “পার্টি” করা এখনকার রাজধানীবাসী কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলে “ডালি-চালি খেচোড়ি”। অর্থাৎ ডাল এবং চাল সহযোগে নিরামিষ খিচুড়ি। শীতের দিনে রোজায়, কোনো কোনো দিন হয়ত, ঘরের চালের সাথে খেজুরের রসের পায়েস হতো। সেগুলোও আমার প্রতিবেশী জেঠিমা, কাকিমা, বৌদিদের কপালে কোনোদিনই জুটত না। কিন্তু কাল মসজিদে ইফতারিতে কি খাওয়ানো হয়েছে, অমুকের বাড়ি থেকে যে খিচুড়ি পাঠানো হয়েছিল, সেইটার স্বাদ কেমন ছিল, সেগুলো আমরা বাড়িতে বসে জানতে পারতাম তাদেরই কল্যাণে।
সত্যি বলতে কী, ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ইফতার পার্টি সম্পর্কে আমার সেই অর্থে কোনো ধারণাই ছিল না। আর হিন্দু পরিবারের জন্মগ্রহণ করার ফলে একটা সংস্কার তো ছিলই। কাল সন্ধ্যাবেলাতে কিছু খাওয়া যাবে না। আমি প্রথম ইফতার পার্টিতে যোগ দেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে। সেইটাও পার্টি বলা যাবে না, হলের একটা রুমে কয়েকজন সিনিয়র মিলে আয়োজন করেছেন, কী কী আইটেম ছিল ঠিক মনে নেই, কিন্তু একটা কলা কয়েক টুকরো করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারে যুক্ত হই। তখন থেকে প্রতি রমজানে আমরা থিয়েটার রুমেই একসাথে ইফতার করতাম। তখন সবাই ১০ টাকা করে চাঁদা দিতাম। এই চাঁদার পরিমাণ শুনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক বন্ধুসম সিনিয়র (যার বদৌলতেই রাবির সেই ইফতার পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলাম) বলেছিলেন, “তোমাদের ক্যাম্পাসে কি সব বড়লোকের পোলাপান পড়ে নাকি? তোমরা ১০ টাকা করে চাঁদা দাও প্রতিদিন ইফতারিতে। আমরাও সংগঠনে ইফতার করি কিন্তু চাঁদা দেই পাঁচ টাকা করে।”
ইফতারে একটা বিষয় আমি খেয়াল করেছি, আয়োজকেরা এমনকি শুধুমাত্র অংশগ্রহণকারীরাও পরস্পর দারুণভাবে এবং আন্তরিকভাবেই সচেতন থাকেন, সবার জন্য ইফতার নিশ্চিত হলো কি-না।
মূলতঃ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই একটু একটু করে ইফতার পার্টির সঙ্গে আমার পরিচয়। কর্মজীবনে এসে আরও বেশি। ইফতারে একটা বিষয় আমি খেয়াল করেছি, আয়োজকেরা এমনকি শুধুমাত্র অংশগ্রহণকারীরাও পরস্পর দারুণভাবে এবং আন্তরিকভাবেই সচেতন থাকেন, সবার জন্য ইফতার নিশ্চিত হলো কি-না। এখানে কে রোজা ছিলেন কি ছিলেন না, কে হিন্দু কে মুসলিম এই বিচারেও কেউ বসেন না।
একবার রমজানের কোনো একদিনে ঢাকার একটা বেসরকারি হাসপাতালে ইফতারের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমাকে হাসপাতালের কমন স্পেস থেকে জরুরি বিভাগে নেওয়ার জন্য, আমার হবু বউ খুব উচ্চস্বরে চিৎকার করছিলেন- “কেন হুইল চেয়ার আসতে এত দেরী হচ্ছে? ইমারজেন্সিতে ঢুকে কেন ডাক্তার নেই?” ডাক্তার এসে আমাকে দেখে বললেন ভয়ের কিছু নেই। এরই মধ্যে ইফতার শুরু হয়ে যায়।
যে ডাক্তারদের সাথে আমার হবু বউ এতক্ষণ রাগতস্বরে, ক্ষোভের সাথে কথা বলছিলেন, সেই ডাক্তারেরাই ওকে বললেন, “আসেন আপা একসাথে ইফতার করি। ও বলল না, আমি ইফতার করব না।” একজন সিনিয়র ডাক্তার বললেন, “আপা, আমরা কি এতই খারাপ যে আমাদের সাথে ইফতার করা যাবে না? এই কথার পর কি কারও “না” করার সাধ্য থাকে? আমার কাছে মনে হয়েছে, একসাথে ইফতারির একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে, এর মধ্যে একটা দারুণ আন্তরিকতার ছাপ থাকে।
কিন্তু বিপরীত কিছু পর্যবেক্ষণও রয়েছে। যেমন ঢাকা শহরের একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম আমাদের এক পারিবারিক বন্ধুর আমন্ত্রণে। আমরা তিনজন, উনারা দুইজন। ইফতার করলাম, আহামরি কিছু নয়। যেহেতু ব্যুফে, প্রায় প্রত্যেক টেবিলে বড়রা বসে আছেন। ছোটরা ঘুরে ঘুরে খাবার এনে টেবিলে জড়ো করছে। বেরিয়ে হওয়ার সময় খেয়াল করলাম, প্রত্যেক টেবিলেই খাবার নষ্ট হয়েছে। যিনি আমাদের ডেকেছিলেন, তিনি ক্যাশে বিল শোধ করার সময় আমাদের সাথে থাকা বোনের ছেলের (যে কি-না আমারই মতো অজপাড়াগাঁ থেকে কিছুদিন হলো ঢাকা শহরে এসেছে) চোখ ছানাবড়া। বাসায় ফিরে আমাদের জিজ্ঞেস করল, “পাঁচজনে ইফতার করে এত টাকা বিল?!”

এই যে সৌন্দর্যের কথা বললাম, আন্তরিকতার কথা বললাম, সেই সাথে এই যে অপব্যয়, ছোট ছোট বাচ্চারা অপরিমিত খাবার এনে টেবিলে জড় করছে, মা-বাবারা বসে বসে দেখছেন এর মধ্যে ঠিক সংযমটা কোথায় সেটা নিয়েও মনে অনেকবার প্রশ্ন জেগেছে।
আজকে এই প্রসঙ্গের অবতারণা একটু অন্য কারণে। শুরুতে আমি যে আমার প্রতিবেশী জেঠিমা, কাকিমা, বৌদিদের কথা বললাম- আমরা শীতের দিনে উঠানে বসে সকালের খাবার খেতাম। আমাদের বাড়িতে ছোট ছোট চৌকি ছিল। সেগুলোতে বসে তারা আমাদের খাওয়া দেখতেন, শীতকালের জন্য অস্থায়ী রান্নাঘরে আমার মা-কাকিমার রান্না দেখতেন। এমনকি ইসলামে হারাম এমন খাবার রান্না দেখতেও তাদের কোনো দ্বিধা দেখিনি, রোজা হালকা হয়ে যাবে কিংবা নষ্ট হয়ে যাবে এমন ভীতি দেখিনি। একটা বিষয় খেয়াল করতাম, রমজানে জেঠিমাদের কেউ কেউ রান্নাঘর থেকে খাবারের তীব্র ঘ্রাণ বের হলে মুখে নাকে মুখে কাপড়ের আঁচল চেপে ধরতেন, কিন্তু দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করা, কিংবা চলমান আলাপ শেষ না করে সরে পড়া এগুলো কখনও দেখিনি।
আরও একটা কথা বলি, ওই যে এক জেঠিমার কথা বলছিলাম না, “খাবারটা হালাল হোতি হবে?” তারা আক্ষরিক অর্থেই এগুলো মেনে চলতেন। নইলে কি আর চাল মুখে দিয়ে পানি খেয়ে তাদের ইফতার করতে হয়? বাড়ির সামনে ফসলের ক্ষেত, টমেটো, বেগুন, মানুষের গাছভর্তি আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আতা। একটা পেড়ে নিলে তখনকার যে গ্রামীণ পরিবেশ, গাছের মালিক যে দু’কথা শুনিয়ে ছাড়বে এমনও নয়। কিন্তু দারিদ্র্যের সাথে নিত্য সংগ্রাম করা আমার এই প্রতিবেশীদের এই দুর্নাম কেউ দিতে পারেনি। তারা হালাল বলতে হালালই বুঝতেন।
এখন চারিদিকে এত অনিয়ম, দুর্নীতির টাকায় ইফতার, রাতের খাবার এবং সেহরি খাওয়া মানুষদেরই নাকি অন্যের খাওয়া দেখলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়! কী বিচিত্র মানসিকতা।
এখন চারিদিকে এত অনিয়ম, দুর্নীতির টাকায় ইফতার, রাতের খাবার এবং সেহরি খাওয়া মানুষদেরই নাকি অন্যের খাওয়া দেখলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়! কী বিচিত্র মানসিকতা। একজন ভিন্নধর্মের নারীর পান খাওয়া দেখে জিহাদি জোশে তার উপর হামলে পড়তে হয়।
এর সামাজিক ফলাফলই যে কতটা ভয়াবহ সেটা একটা ছোট ঘটনার মাধ্যমে বলি- রমজান মাস। লালমাটিয়াতে একটা দোকানে চা খাচ্ছি, একজন বয়স্ক লোক এসে দোকানির কাছে পান চাইলেন। পান আছে, কিন্তু দোকানদার বিক্রি করবেন না! কারণও বলবেন না। বুঝলাম, রমজান মাসে কোনো লোক পান খেয়ে রাস্তায় ঘুরবে, তা উনি চান না। কিন্তু সেই কথা ক্রেতাকে বুঝিয়েও বলবেন না। মানে ব্যবসাও করব, আবার সওয়াবও আদায় করব। লোকের সাথে খারাপ ব্যবহারও করব। এই যে পরিবর্তন এগুলো তো এক দিনে হয়নি। এগুলোর, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানাবিধ কারণ রয়েছে। সেগুলোর বিশ্লেষণও জরুরি। সবকিছুকে ধর্মের আলোকে ব্যাখ্যা করতে গেলে ধর্মের প্রতি নির্মোহ, কিংবা ভিন্ন ধর্মের মানুষেরা ইসলাম অনুসারীদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবে।
আমাদের দেশে একটা সাধারণ প্রবণতা হলো,ধর্মের নামে ভিন্নধর্মের মানুষের ওপর হামলা, বাড়িঘর, উপাসনালয়ে ভাংচুর, লুটপাট। এসবের পর এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমেরা বলেন, “এগুলোকে ইসলাম সমর্থন করে না, যারা এগুলো করেছে, তারা প্রকৃত মুসলমান নয়।”
এখন কথা হলো, তাতে কি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনো মানসিক স্বস্তি মেলে?
ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা যদি আক্রমণকারীদের গিয়ে বলতেন, “তোমরা ইসলাম-বিরুদ্ধ কাজ করেছ। তোমরা ইসলামের অবমাননা করেছ। তোমরা এটা করতে পার না।”
এটা একটা পরোক্ষ বার্তা। ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা যদি আক্রমণকারীদের গিয়ে বলতেন, “তোমরা ইসলাম-বিরুদ্ধ কাজ করেছ। তোমরা ইসলামের অবমাননা করেছ। তোমরা এটা করতে পার না।” কিন্তু এমন নজির বিরল।
রমজান মুসলমানদের, কিন্তু ইফতার এখন সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। আমরা মায়ের কাছ থেকে আমরা জেনেছিলাম, “সন্ধ্যাবেলায় কিছু খেতে নেই।” সেই মা-ই এখন সন্ধ্যায় আমাদের সঙ্গে ইফতারে বসে যান। ইফতারের এই সৌন্দর্য অব্যাহত থাকুক, এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বৃদ্ধি পাক। একই সাথে রমজানের দোহাই দিয়ে মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার, ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর, নারীদের ওপর হামলার অবসান হোক।



