ঘুমের সময় অনেকেরই দাঁত কিড়মিড় করে। ফলাফল, পরদিন সকালবেলায় মুখ ভারী হয়ে থাকা কিংবা ক্রমশ দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার মতো বিপদ। অনেকে অবশ্য দাবি করেন পেটে কৃমি হলেই নাকি এরকম দাঁত কিড়মিড় করে।
এর পেছনে মূল কারণ হলো, ব্রুক্সিজম নামে এক ধরনের অসুখ। যা সাধারণত বাচ্চাদের ভেতর বেশি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদের ভেতরও এর প্রবণতা কম দেখা যায় না।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যজুড়ে লাখ লাখ নারী ব্রুক্সিজমে আক্রান্ত।
তবে গবেষণা বলছে, অনেক মানুষ মানসিক চাপের কারণে দাঁতে দাঁত ঘষেন বা চোয়াল শক্ত করে রাখেন।
ব্রুক্সিজম শুধু দাঁত ঘষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দাঁত শক্ত করে চেপে রাখা, চোয়াল শক্তভাবে আটকে রাখা কিংবা চোয়াল সামনে ঠেলে দেওয়ার মতো অভ্যাসও এর অন্তর্ভুক্ত।
সমস্যাটি দিনের বেলায় হতে পারে, আবার ঘুমের সময়ও দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজে বিষয়টি বুঝতে পারেন না। তবে শরীর কিছু সংকেত দিতে পারে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা বা মুখে ব্যথা, চোয়ালে শক্তভাব, দাঁত অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া, দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যাওয়া কিংবা দাঁত ভেঙে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কোনো সংক্রমণ না থাকলেও কানের আশপাশে ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘদিনের সমস্যায় ঘুমের মান কমে গিয়ে দিনের বেলায় ক্লান্তিও বাড়তে পারে।
মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
মানসিক চাপের সময় শরীর নিজেকে সম্ভাব্য বিপদের জন্য প্রস্তুত করে। হৃদস্পন্দন বাড়ে, স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ হয় এবং পেশিতে টান তৈরি হয়। চোয়ালের পেশিও সেই প্রতিক্রিয়ার বাইরে নয়।
ফলে দিনের চাপ অনেক সময় ঘুমের মধ্যেও শরীরের সঙ্গে থেকে যায়। কেউ ঘুমের সময় দাঁত ঘষেন, আবার কেউ জেগে থাকা অবস্থায় অজান্তেই দাঁত চেপে রাখেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাহি পোপাটের মতে, অনেক রোগী তাদের দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাসের সঙ্গে জীবনের চাপপূর্ণ সময়ের সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পান। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতার কথা তিনি শুনেছেন।
অর্থাৎ, চোয়ালের এই অস্বাভাবিক নড়াচড়া কখনো কখনো শরীরের পক্ষ থেকে মানসিক চাপের একটি সংকেতও হতে পারে।
শুধু দাঁতের সমস্যা নয়
ব্রুক্সিজমকে আগে মূলত দাঁত ও চোয়ালের যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আরও বিস্তৃত। এর সঙ্গে ঘুম, মানসিক চাপ, জীবনযাপন এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমের সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার অভ্যাস থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই রোগে ঘুমের সময় শ্বাসনালি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন শরীর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, যার সঙ্গে দাঁত ঘষার প্রবণতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
তাই শুধু দাঁতের ক্ষয় দেখে চিকিৎসা শেষ না করে রোগীর ঘুমের ধরন, ওজন, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ওষুধ সেবন এবং অন্যান্য উপসর্গও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন চললে কী হতে পারে?
দাঁত কিড়মিড় করার অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী হলে দাঁতের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এতে দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয়ে যেতে পারে, দাঁত চ্যাপ্টা হয়ে যেতে পারে কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে দাঁত ফেটে বা ভেঙেও যেতে পারে।
চোয়ালের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ায় মুখ ও চোয়ালে ব্যথা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিনের ব্যথা আবার ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে গুরুতর দাঁতের ক্ষতি তৈরি হতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে। তাই শুরুতেই লক্ষণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
চিকিৎসা কী?
ব্রুক্সিজমের চিকিৎসা নির্ভর করে এর কারণ ও তীব্রতার ওপর। দাঁতকে ঘষাঘষির ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে চিকিৎসকের পরামর্শে রাতে মাউথগার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।
যদি সমস্যার সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্পর্ক থাকে, তাহলে শ্বাসনালি খোলা রাখতে সিপ্যাপ বা ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইসের মতো চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
চোয়ালের পেশির সমস্যা কমাতে ফিজিওথেরাপি নেওয়া যায়। মানসিক চাপ বা উদ্বেগের ভূমিকা থাকলে সিবিটির মতো থেরাপি সহায়ক হতে পারে।
জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে চোয়ালের অতিরিক্ত সক্রিয় পেশি শিথিল করতে বোটক্স ইনজেকশনও ব্যবহার করা হয়। তবে এটি সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয় এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
চোয়ালের এই নড়াচড়া কি কখনো উপকারী?
ব্রুক্সিজমের সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় বা চোয়ালের ব্যথার মতো ক্ষতিকর দিক থাকলেও গবেষকেরা এর কিছু সম্ভাব্য শারীরবৃত্তীয় ভূমিকার কথাও বলছেন।
চোয়ালের পেশি নড়াচড়া করলে লালা উৎপাদন বাড়তে পারে। এতে মুখ পরিষ্কার রাখতে এবং দাঁত সুরক্ষায় ভূমিকা থাকতে পারে। চিবানোর মতো চোয়ালের নড়াচড়া মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ ও জ্ঞানগত কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
তবে এসব সম্ভাব্য উপকারের কারণে দীর্ঘস্থায়ী দাঁত ঘষার অভ্যাসকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সবশেষে বিষয়টি দাঁতের চেয়েও বড় একটি প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে-শরীর কখনো কখনো মনের চাপের কথাও নিজের ভাষায় জানায়। ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষা কিংবা সারাক্ষণ চোয়াল শক্ত করে রাখা সেই ভাষারই একটি রূপ হতে পারে।
তাই নিয়মিত এমনটি হলে শুধু দাঁতের ক্ষয় হচ্ছে কি না, সেটি দেখলেই হবে না। কেন এমন হচ্ছে, ঘুমে কোনো সমস্যা আছে কি না, কিংবা মানসিক চাপ শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলছে-সেটিও খুঁজে দেখা জরুরি।



