“আমাকে নিয়ে নানা গল্প আছে
সেই গল্পে আছে একটা ফাঁকি
বিরাট একটা বৃত্ত এঁকে নিয়ে
ভেতরে নাকি আমি বসে থাকি।
কেউ জানে না শাওন, তোমাকে বলি
বৃত্ত আমার মজার একটা খেলা
বৃত্ত-কেন্দ্রে কেউ নেই, কেউ নেই
আমি বাস করি বৃত্তের বাইরেই।”
- হুমায়ূন আহমেদ, মেহের আফরোজ শাওনকে লেখা চিরকুট, বলপয়েন্ট
বৃত্ত বা বৃত্তের বাইরে কোথাও তিনি নেই। স্রেফ নেই। তার না থাকার এই এক দশকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলছে এখন। এ আয়োজন প্রাঙ্গনের প্রতিটি ধূলিকণার হাহাকার তার জন্য। অদেখা ভূবনে থাকা হুমায়ূনের কেমন লাগছে এ ক্ষণ? এ প্রশ্নের উত্তর কোথা পাই?
লীলাবতী উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন,
‘‘শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ
কবি, আমি কখনো গদ্যকার হতে চাইনি।
আমি আপনার মতো একজন হতে চেয়েছি।
হায়, এত প্রতিভা আমাকে দেয়া হয়নি!’’
হুমায়ূন আহমেদ কী হতে চেয়েছেন, আর কী হয়েছেন তার সাক্ষ্য সৃষ্টিকর্ম। তবে বিধি তাঁকে কিছু কম দেয়নি। প্রয়াণের অনন্তকাল পরেও তার কর্ম নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বলতা ছড়াবে সে ভবিষ্যত দৃশ্যমান।
বহুমাত্রিক স্রষ্টার নতুন এক পরিচয় অনবদ্যতায় উন্মোচিত হয়েছে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথমা প্রকাশন প্রকাশিত বই ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’-এ। হুমায়ূনের জীবদ্দশায় তেমন আলোচিত না হওয়া এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জাদুশিল্পী ও কবি এম এ জলিল। মৃত মানুষকে নিয়ে গালগল্প না করে ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইয়ে তিনি তুলে ধরেছেন তথ্যবহুল, ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ, আলোকচিত্র ও ড্রয়িং সমন্বিত এক অদেখা জাদুকরকে। হুমায়ূন চর্চায় দৃষ্টান্ত গ্রন্থ হিসেবে এ বইয়ের আলোচনা বাংলা ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া এক নন্দিত কীর্তিমানকে পরিচিত করার স্বার্থেই।
‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’-বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন হুমায়ূন অনুজ ও দেশের একমাত্র স্যাটায়ার ম্যাগাজিন উন্মাদ এর সম্পাদক, লেখক, কার্টুনিস্ট ও গ্রাফিক নভেল শিক্ষক আহসান হাবীব। পাঠক নিশ্চিন্তে এ বইয়ে প্রবেশ করবেন। কারণ, স্বীয় অগ্রজের কর্ম নিয়ে লেখা এ বইয়ের ভূমিকায় আহসান হাবীব লিখেছেন, “... আমি বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পেলাম . . .”। অদেখা ভূবনে হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার প্রায় ৮ বছর পর প্রকাশিত এ বই সম্পর্কে তিনি আরও লিখেছেন, “ আসলে হয়তো সময়ের অনেক পরে লিখলে পর্যবেক্ষণ আরও বেশি তীক্ষ্ণ হয়..”।
হুমায়ূনচর্চায় স্তুতির চেয়ে নির্মোহ তীক্ষ্ণতা বেশি জরুরি। তাই লেখক এম এ জলিলের প্রতি অনন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন প্রত্যেক হুমায়ূন ভক্তই। ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইটি ২২টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। ১১৬ পৃষ্ঠার এ বই ‘‘শুরুর কথা’’ থেকে আরম্ভ করে ‘‘তথ্যসূত্র’’ অধ্যায়ে শেষ। গোগ্রাসে তা পড়ে পাঠক বিস্ময়মানব হুমায়ূন আহমেদকে চিনবেন নতুন করে।
লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ এর আবির্ভাব ১৯৭২ সালে। বাংলা কথাসাহিত্যে বাঁক বদলের ইঙ্গিত দেওয়া সে অজর উপন্যাস ‘‘নন্দিত নরকে’’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র তখন তিনি। বয়স মাত্র ২২ বছর। যদিও তার লেখা প্রথম উপন্যাস ছিল ‘‘শঙ্খনীল কারাগার’’। এ বইটি প্রকাশ পায় পরে। এ তথ্য বহুচর্চিত। হুমায়ূন ভক্তদের অনেকেরই তা অজানা নয়। তবে ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইয়ে লেখক এম এ জলিল হাজির করেন এক অন্য সৃষ্টিমানকে। পাঠক জানবেন লেখনীতে জাদু ছড়ানোর আগে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন জাদুশিল্পী। ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান টেলিভিশনে জাদু প্রদর্শন করেন। তাই তথ্য প্রমাণ করে, হুমায়ূন আহমেদ আগে ছিলেন জাদুশিল্পী, পরে হয়েছেন লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই ঢাকা কলেজে পড়ার সময় থেকেই তার এ খ্যাতি।
হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, “...দুই বছর পর ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে বেরুলাম। বন্ধুমহলে আমি তখন ম্যাজিশিয়ান হুমায়ূন বলে পরিচিত। ”
আমৃত্যু জনপদের অন্যতম কেন্দ্রিয় চরিত্র হয়ে থাকা এ মায়েস্ত্রো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ জাদু সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিশিয়ানস-এর সম্মানিত সদস্য। মানুষকে মোহিত করার এ নেশা তিনি লালন করেছেন শৈশব থেকে। জাদুবিদ্যা নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করতেন। দেশ বিদেশের যেখানেই গেছেন সেখান থেকেই জাদুর সরঞ্জাম ও এ বিষয়ক বই, ডিভিডি সংগ্রহ করেছেন।
দেশের গর্ব বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের ভাষায়, “ক্লোজআপ ম্যাজিকে হুমায়ূন আহমেদের ছিল রাজার ভাণ্ডার।” তীব্রভাবে নতুন কিছু শেখার একাগ্রতা তাকে জাদুশিল্পে মর্যাদায় আসীন করে।
হুমায়ূন আহমেদ তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, “জাদুর জন্য যে সাধনা করতে হয়, তার চাইতে অনেক কম সাধনাতেই ঈশ্বর ধরা দেন।”
ব্যর্থতা নামে কোনো শব্দ হুমায়ূন আহমেদের জীবনে ছিল না। যাতে হাত দিয়েছেন তাতেই সাফল্যের শীর্ষে। জাদুবিদ্যায় অনবদ্যতা তারই নজির মাত্র। ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইয়ের লেখক এম এ জলিল ১৯৯০ সালে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হন। তখন বাংলা সাহিত্যের বাদশাহ নামদার স্ত্রী গুলতেকিন ও সন্তানদের নিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। আমুদে স্বভাবের হুমায়ূন আহমেদ জাদুশিল্পীদের কদর করতেন। হুমায়ূন আহমেদে পরিবারের দরজার উন্মুক্ত হয়ে যায় বইয়ের লেখক ও জাদুশিল্পী এম এ জলিলের জন্য। জাদুবিদ্যা নিয়ে অবাধ চর্চা হতো দু’জনের মধ্যে। বইয়ে সে অন্তরঙ্গতা প্রকাশিত ছবিসহ। হুমায়ূন তনয়া শীলা আহমেদ ও বিপাশা পারিবারিক আসরে এম এ জলিলের সঙ্গে জাদু প্রদর্শনে সহকারীর ভূমিকায় থাকতেন।
‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখক এম এ জলিল সম্পর্কে জানা যায়, জাদুশিল্পী হিসেবে মাইগ্রেশন নিয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাস করছেন। ১৯৯১ সালে সালে তিনি বাংলাদেশ যাদুকর পরিষদ আয়োজিত জাতীয় যাদু প্রতিযোগীতায় স্বর্ণপদক জেতেন। ম্যাজিক চর্চার পাশাপাশি তিনি কবিতাও লেখেন। ‘‘গাও গেরামের কথা’’ ও ‘‘কষ্ট’’ এম এ জলিলের প্রকাশিত দুটি কাব্যগ্রন্থ। তার কবি ও লেখক সত্ত্বা সুস্পষ্ট ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইয়ের পাতায় পাতায়।
আলোচ্য বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী শিবেন চক্রবর্তী। ভেতরের স্কেচ এঁকেছেন আহসান হাবীব। সুসম্পাদিত বইয়ের জন্য খ্যাত প্রথমা প্রকাশনের এ বইয়ের গায়ে লেখা দাম ২৫০ টাকা।
অন্য এক হুমায়ূন আহমেদকে জানতে ‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইটির পাঠ জরুরি। লেখক এম এ জলিল বইটি উৎসর্গ করেছেন হুমায়ূন আহমেদের বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজকে। হুমায়ূন আহমেদ যেমন মানুষের অন্তরে মুগ্ধতা তৈরিতে সক্ষম, তার জাদুচর্চা নিয়ে লেখা বিরল বইয়ে লেখক এম এ জলিলও সে পথেই হেঁটেছেন। পুরো হুমায়ূন পরিবারের ওপর অপার শ্রদ্ধাবোধ এ বইয়ের আদ্যোপান্ত জুড়ে।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্ম প্রমাণ করে শুধু নুহাশপল্লী নয়, পুরো বাংলাভাষী জনপদই তার জাদুর ভূগোল। তাই বাংলা কথাসাহিত্যের স্তম্ভকে নিয়ে লেখা বইয়ে লেখক এম এ জলিল ছিলেন পুরো মাত্রায় সংবেদনশীল। হুমায়ূন আহমেদের জন্মভিটা মোহনগঞ্জ থেকে প্রয়াণের বেলভিউ হাসপাতাল, নুহাশপল্লীতে দাফন কোনো কিছু থেকেই এম এ জলিল চোখ ফিরিয়ে রাখেননি।
‘‘জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ’’ বইটি নিজ গুণেই পাঠক প্রিয় হবে আশা করা যায়। জীবিত হুমায়ূনের মতো অনন্তলোকের হুমায়ূনও কম প্রভাব বিস্তারকারী নন। তাকে নিয়ে নিয়মিতই সৃষ্টিশীলরা মুখর হবেন। যে হুমায়ূন জনতার তার আবার বিনাশ কিসের?



