চলছে সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে পবিত্রতম মাস রমজান। এই মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোজা রাখেন মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা। আর রোজা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি ফরজের একটি। তাই মুসলমানদের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক।
তবে ইসলাম ধর্মের প্রচারের আগে থেকেই মক্কা ও মদিনায় রোজা রাখার রীতি ছিল।কিন্তু বর্তমানে যেভাবে রোজা রাখা হয়, একেবারে শুরুর দিকে সেভাবে রাখা হতো না।
ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নিজে মাঝে মাঝে রোজা রাখলেও শুরুর দিকে উম্মত বা সাহাবীদের জন্য রোজা রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল না।
ইসলামে রোজা বা রমজান ফরজ হিসাবে বাধ্যতামূলক করা হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে। এরপর থেকেই অপরিবর্তিত রূপে সারাবিশ্বের মুসলমানরা রোজা পালন করে যাচ্ছেন।
রমজানের মতো না হলেও ইহুদি এবং অন্যান্য আরও অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রোজার মতো সারাদিন পানাহার না করার ধর্মীয় রীতি দেখা যায়।
যেভাবে রোজা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলো
যে বছর রোজা ফরজ করা হয়েছিল, তার দুই বছর আগে ৬২২ খৃষ্টাব্দে মক্কা থেকে সাহাবীদের নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ।
হিজরতের তারিখ থেকে মুসলিমদের হিজরি সাল গণনা শুরু করা হয়।
হিজরি দ্বিতীয় বছরে রমজান মাসে রোজা রাখা বাধ্যতামূলক বা ফরজ ঘোষণা করে আয়াত নাজিল হয় বলে অভিমত ইসলাম বিশেষজ্ঞদের।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাসুল আলম যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কোরআনে যে আয়াত দিয়ে রোজা ফরজ করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী জাতিসমুহের ওপরেও রোজা ফরজ ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “তার মানে এটা বোঝা যায় যে, আগে থেকেই বিভিন্ন জাতির মধ্যে রোজা রাখার চল ছিল, যদিও সেটার ধরন হয়তো আলাদা ছিল। যেমন ইহুদিরা এখনো রোজা করে, অন্যান্য জাতির মধ্যেও এ ধরনের রীতি আছে।”
তিনি জানান, সেই সময় মক্কা বা মদিনার অনেকে আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। আবার কেউ কেউ চান্দ্র মাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান মিয়াজি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অন্যান্য পয়গম্বরদের জন্য রোজা ফরজ ছিল, তবে সেটা একমাস ব্যাপী ছিল না, ছিল আংশিকভাবে।”
তিনি আরও বলেন, "ইসলামের নবীও মক্কায় থাকার সময় চান্দ্র মাসের তিনদিন করে সিয়াম সাধনা করতেন, যা হিসাব করলে বছরে ৩৬ দিন হয়। অর্থাৎ সেখানে আগে থেকেই রোজা রাখার বিধান ছিল।”
ইসলামের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নবী আদমের সময় মাসে তিনদিন, নবী দাউদের সময় একদিন পরপর রোজা রাখা, নবী মুসার সময় প্রথমে তুর পাহাড়ে তিনি ৩০দিন রোজা রাখেন। পরবর্তীতে আরও ১০দিন যোগ করে একটানা ৪০ দিন তিনি রোজা রেখেছিলেন।”
তিনি জানান, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ৬২২ খৃষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর মদিনাবাসীকে আশুরার দিনে রোজা রাখতে দেখেন। এরপর তিনিও সেই রোজা রাখতে শুরু করেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মোফাচ্ছির এবং উপ-পরিচালক ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পূর্ববর্তী নবীদের ওপর ৩০ রোজা ফরজ ছিল না। কোনো কোনো নবীর ওপর আশুরার রোজা ফরজ ছিল, কোনো কোনো নবীর ওপর আইয়ামুল বিজের (চন্দ্র মাসের ১৩,১৪,১৫) রোজা ফরজ ছিল।”
তিনি বলেন, “রসুল (সা.) মক্কায় থাকার সময় ফরজ রোজা রাখতেন, এমন তথ্য পাওয়া যায় না। মদিনায় হিজরত করার পরে যখন তিনি দেখলেন যে, মদিনার লোকজন আশুরার তারিখে রোজা রাখছে। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমরা কেন রোজা রাখো? তারা বলল, এই দিনে মুসা (আ.) কে আল্লাহ ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন বলে আমরা রোজা রাখি।”
তিনি আরও বলেন, “নবীজী বললেন, মুসা (আ.) এর জন্য হলে তো তোমাদের চেয়ে আমি বেশি হকদার। তখন তিনিও রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরও রাখতে বললেন। সেই সঙ্গে তিনি বললেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি দুই দিনেই রোজা রাখবো।”
তবে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নফল রোজা হিসেবে আগে থেকেই আইয়ামুল বিজের বা চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন বলে জানান ড. পাটোয়ারি।
ইসলাম ধর্মের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবী আদম (আ.) এর সময় আইয়ামুল বিজের (চান্দ্র মাসের তিনদিন) রোজা রাখা হতো। আরেক নবী মুসা (আ.) এর আমলে আশুরার রোজা রাখা হতো। আরব দেশগুলোতে এই দুই ধরনের রোজা রাখার চল ছিল। তবে ৩০ দিনের রোজা শুধুমাত্র ইসলামের নবী মোহাম্মদের আমল থেকে ফরজ করা হয়।
ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী বলেন, “এই দুই রোজাই হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নফল হিসেবে রাখতেন। হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের আগে ফরজ (বাধ্যতামূলক) হিসেবে কোনো রোজা রাখেননি।”
হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে বা ৬২৪ খৃষ্টাব্দে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য রোজা ফরজ করা হলেও বিশেষ কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির কারণে রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়নি বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বরং ইসলামের বিধিবিধানের অংশ হিসেবেই সেটা ফরজ করা হয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
ড. পাটোয়ারি বলেন, “কোরাআনের যে সুরা বা আয়াতগুলো ইসলামের নবীর মক্কায় থাকার সময় নাজিল হয়েছে, সেগুলোয় আকিদা, ইমান, একাত্মবাদের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। আবার মদিনায় নাজিল হওয়া সুরাগুলোয় ধর্মের নানা বিধিবিধান নাজিল হয়েছে। তার একটি হচ্ছে রোজা।”
রোজার নিয়মে পরিবর্তন
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মোফাচ্ছির এবং উপ-পরিচালক ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী বলেন, “প্রাথমিক অবস্থায় রোজা ধাপে ধাপে সহনীয় করে তোলা হয়েছিল। রোজা ফরজ করা হলেও কেউ যদি মনে করতেন যে, তিনি রোজা রাখতে পারবেন না, ইচ্ছা করলে তিনি ফিদইয়া দিয়ে দিতে পারতেন। (এর অর্থ হলো প্রতিটা রোজার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণের জম বা তার মূল্য গরিবদের দান করে দেয়া।)”
তিনি বলেন, “এটা সাময়িকভাবে কিছুদিন ছিল, তবে পরবর্তীতে সেটা সবার ফরজ করে দেয়া হয় যে, রোজার মাস উপস্থিত হলে সবাইকে রোজা রাখতে হবে।”
তিনি জানান, এরপরে আবার আল্লাহ পাক নির্দেশ দিলেন, সন্ধ্যা থেকে এশার আজানের মধ্যবর্তী সময়ে খাবার-দাবার বা অন্যসব কাজ করতে হবে। এশার আজান হয়ে গেলে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর খাওয়া যেতো না। কিন্তু এতেও সাহাবীদের অনেকের কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। খাবার খেতে খেতে এশার আজান হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “এরকম দুইটি ঘটনা ঘটে। এরপর আল্লাহ পাক, তাদের কষ্টের কথা বুঝে আয়াত নাজিল করলেন যে, এখন থেকে সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখবে। এই বিধানটি পরবর্তীতে চূড়ান্ত হয়ে গেছে।”
এইসব পরিবর্তন দ্বিতীয় হিজরিতেই রোজা ফরজ করার রমজান মাসেই হয়েছিল বলে জানান তিনি।
সেই সময় রোজা শুরুর আগে ও পরে মূলত খেজুর, পানি, মাংস ও দুধ খাওয়া হতো বলে জানান ইতিহাসবিদরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, “তখন আরবের মানুষ সেহরি এবং ইফতারে অনেকটা একই ধরনের খাবার খেতেন, যার মধ্যে রয়েছে খেজুর, জমজমের পানি। কখনো কখনো উট বা দুম্বার দুধ এবং মাংসও খাওয়া হতো।”



