যেন দীর্ঘায়িত হলো সুবহে সাদিক। “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউয়ুম” আর “আল্লাহু আকবার” মাইকের সমাপ্তি টানল না। ঘোষিত হলো মৃত্যু বার্তা। “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
অন্যদিকে প্রভাতী নার্সিং হোমে রাত সাড়ে চারটা নাগাদ ডালিয়ার প্রসব বেদনা চরমে। নার্স, ডাক্তার নিয়ে গেলেন ওটিতে। বাইরে অপেক্ষায় স্বামী সাব্বির। আধ ঘণ্টা পর ফুটফুটে এক মেয়ে নিয়ে নার্স সাব্বিরের সামনে। সে কোলে নেয়। ডাক্তার জানায়, মেয়ে-মা দুজনই ভালো আছেন। সিজার প্রয়োজন হয়নি। সাব্বিরকে কিছু ওষুধ আনতে যেতে হবে। সাব্বির লিফটের পথে।
এমন ভোরেও লিফটে মানুষ ভরা। সিসিইউ থেকে এক মৃত রোগীর মরদেহ নামবে। সাব্বির সরে দাঁড়ায়। মরদেহের দিকে তাকায়। চাদর ঢাকা পুরো শরীর। পায়ের নখ অবশ্য দেখা যাচ্ছে। কেমন নীলচে রং। নার্স যখন তার মেয়েকে কোলে দেয় তখন ও ছিল নীল টাওয়ালে আবৃত। তার নবজাতক মেয়েকেও নীলচে লাগছিল। সাব্বির ভাবে দুই নীলে কত তফাৎ। এক যাত্রা শুরুর। আরেক পথ শেষের।
নিচে মরদেহ তোলা হচ্ছে ফ্রিজিং ভ্যানে। তাতে বড় লাল হরফে লেখা “মেরামতের অযোগ্য-লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যান।”
সাব্বির গেল ওষুধের দোকানের কাউন্টারে। সেখানে তর্ক-বিতর্ক। মাত্র মৃত ব্যক্তির জন্য কিছু ইনজেকশন কেনা হয়েছিল। তা ব্যবহারের আগেই রোগী মারা যান। এখন ফার্মেসির লোকরা তা ফেরত নিতে চাচ্ছেন না। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রোগীর স্বজনদের বিবাদ। সাব্বিরের মনে হয়, মৃত্যুতেই সব শেষ হয় না। বাকি থাকে অনেক পর্ব।
মহল্লার মসজিদে এদিকে ফজরের নামাজ শেষ। মুসল্লি ও মৃত ব্যক্তির স্বজনরা আছেন জানাজার প্রস্তুতিতে। এখনও মরদেহ আসেনি। হাসপাতাল থেকে গোসল করিয়ে আনা হবে। কিছুটা অপেক্ষা পর্ব। এর ফাঁকে ফাঁকে স্বজনদের কান্না।
হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে সাব্বির অবশেষে ওষুধ নিতে পারে। লিফট থেকে বের হয়ে দেখে ডালিয়াকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। ডালিয়া ঘুমাচ্ছে। তার মা জীবনের প্রথম ঘুম। খুব প্রশান্ত দেখায় তাকে। নিজের মেয়েকে কোলে নেয় সাব্বির। কেবিনের জানালার কাছে দাঁড়ায়। কুয়াশা চারদিকে। নিচে দেখতে পায় সেই লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যান। শুনতে পায় এর তীব্র সাইরেন। ডালিয়া ততক্ষণে চোখ মেলেছে। বলে, “বাবু কই?” নবজাতককে ওর বুকের কাছে দেয় নার্স ও সাব্বির। কুয়াশায় এর মধ্যে হারিয়ে গেছে মরদেহবাহী গাড়িটি।



