সাইরেন শুরু হয়ে গেল। গাড়িটা রাখি কোথায়? আমিও বা কই আশ্রয় নিই। এখানে আশ্রয়ের কী আছে? এখন মরব। না হয় কাল, পরশুর মধ্যে মরব।
চারপাশে সব ধ্বংসস্তুপ। কোনো মানুষ নেই। কয়েক দিন আগেও এগুলো ৬ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। শেষ হামলায় এখন এই অবস্থা। বিল্ডিংগুলোর এখানে ওখানে রড বের হয়ে আছে। দেখতে লাগছে প্রাণহীন কঙ্কাল।
ঘড়িতে দেখি সোয়া বারোটা বাজে। দিনের মিসাইল তাও একদিকে ভালো। অন্তত চারপাশ দেখতে দেখতে মরা যায়। রাতের বেলায় মনে হয় দোজগ। শেষ হামলাগুলোয় অবশ্য রাতদিনের নিস্তার ছিল না।
ছোট এক বোতল পানি পেয়েছি হাইফায়। সেটা নিয়ে গাড়ি থেকে নামি। মৃত্যুর সময় যেন পানির তেষ্টা না পায়। অবশ্য গাড়িতে আর কিছু নেইও। সারা একটা পাওয়া ব্যাংক গিফট করেছে। ওটা আছে পেছন সিটে। থাক, আমি না থাকলে অন্য কারও কাজে আসবে। বিদ্যুৎ কবে গাজায় ফিরবে আমরা তো জানি না। অন্তত ফোনগুলো জীবিত থাক।
কানের পর্দা ফাটা শব্দে মিসাইল পড়ছে। আমি ধ্বংসস্তুপে বসে আছি। পানি খেলাম এক ঢোক। বোতলে পড়ি ইংরেজিতে লেখা- “ফর ফিলিস্তিনি পিপল।” হাসি পায় এই মরণকালে।
১২ বছর বয়সে এক রাতে আমি পুরো পরিবারকে হারাই। তখন অবশ্য হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। মিসাইল পিষে দিয়েছিল আমাদের বাড়ি। সাইরেন শুরুর পর বেইজমেন্টের এক রুমে আশ্রয় নিই বাবা, মা আর আমার দুই বোন। আল্লাহ শুধু আমাকেই বাঁচান। কারও জানাজা, দাফনে আমি ছিলাম না। জ্ঞান হারানো অবস্থায় ষোল দিন আমার চিকিৎসা চলে হাসপাতালে। খোদার খেলা হলো হামলার রাতে বেইসমেন্টে আমাদের গাড়িটা অক্ষত থাকে। মানুষেরা সব মরে যায়।
সেই গাড়িই এই গাড়ি। আমার একমাত্র রিজিক। গত কয়েক দিনে যেমন হাইফার ট্রিপ পেয়েছি অনেকগুলো।
আমার বান্ধবী সারা দানিউবের অবশ্য উপার্জন ভালো। ও মিসরীয় খ্রিস্টান বংশের। আমরা জাতিসংঘের স্কুলে পড়েছি একত্রে। সেই থেকে বন্ধুত্ব। ও বড় হয়েছে শরণার্থী শিবিরে। ওর ছোটবেলায় পরিবার হারানোর কাহিনি আমার মতোই মিসাইলঘটিত। পার্থক্য শুধু ওর বয়স ছিল তখন ৭। আমার মতো ওরও দুই বোন, বাবা, মা। ফিলিস্তিনে নতুন কিছু ঘটে না। পুরনো গল্পই ফিরে ফিরে আসে।
সারা এক রুমের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে। ফটোশপে ছবি, চেহারা পতাকা অদল-বদল করে। গাজায় এ ধরনের কাজের প্রচুর ডিমান্ড। সবাই শহিদ হতে চান। বাচ্চারা বাবা, মায়ের কাছে আবদার করে, কুরআনের আয়াত আর কালাশনিকভ রাইফেলধারী ছবি আমার চাই। তখন অভিভাবকদের আর কী করার থাকে!
শব্দ থেমেছে। গত কয়েক দিনে বিমান, ড্রোন আর মিসাইলগুলোও মনে হয় ক্লান্ত। জায়গাটা থেকে বের হওয়া দরকার। গাড়ি দেখলাম ঠিকঠাক। কয়েক ব্লক সামনে হামলা হয়েছে। বাড়িগুলোয় কেউ ছিলেন না। শহরের অধিকাংশ মানুষ এখন জাতিসংঘের আশ্রয় শিবিরে। আগে সবাই আশ্রয় নিতেন কাছের হাসপাতালে। আহলি আরাব হাসপাতালে হামলার পর কেউ আর সে ভুল করছেন না।
হাইফায় পৌঁছে সারার সাথে কথা হয়েছিল। এরপর যোগাযোগহীন। শহরের অবস্থা জানি না। স্থল অভিযান কি শুরু হয়েছে? গাড়িতে উঠে ওর ফোনে কল দিই। সারা ওর ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ফোনে, মেইলেই যোগাযোগ রাখে। কখনও ওকে দুবার কল দিতে হয় না। কিন্তু এখনের কলটা ও ধরছে না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কল বেজেই যাচ্ছে। মাথা কাজ করে না। বিষয় কী? পুরো ফাঁকা সামনের সালাউদ্দিন রোড। তবু হর্ন দিতে দিতে চলতে থাকি।



