রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে জনজীবনে অস্বস্তি পৌঁছেছে চরমে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রতিকুল অবস্থা আশঙ্কাজনক। অত্যাধিক ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণে নানা ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হয়। আর এই ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে এই কম বয়সী শিক্ষার্থীরাই।
প্রতিকূল এই আবহাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজন যথাযথ পদক্ষেপ। উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। চলুন, গরমের তীব্রতা থেকে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়গুলো জেনে নেওয়া যাক।
আরামদায়ক পোশাক পরিধান করা
শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়াসহ বিভিন্ন উপলক্ষে ঘরের বাইরে থাকার সময়ে হালকা বুনন, হালকা ও এক রঙের কাপড় পরতে হবে।
হাতাকাটা শার্ট বা গেঞ্জি এবং হাফ প্যান্ট বা শর্ট্স এক্ষেত্রে ভালো। তবে কাপড়ের উপাদান এবং শিক্ষার্থীদের শরীরের কতটা অংশ উন্মুক্ত থাকছে সেদিকে কড়া নজর দেওয়া আবশ্যক।
এছাড়া হাতাকাটা বা শর্ট্সের ক্ষেত্রে কাপড় যদি অনেক মোটা বা ভারি হয়, তাহলে তা আরও গরম করে তুলতে পারে। উপরন্তু, রোদের সংস্পর্শে উন্মুক্ত হাত-পায়ের চামড়া পুড়ে যেতে পারে। তাই শরীর যতটা ঢেকে রাখা যায় ততই ভালো। অর্থাৎ লম্বা হাতা এবং লম্বা প্যান্ট বেছে নেওয়া ভালো। আর কাপড় ঢিলেঢালা ফিটিং ও হালকা রঙের হলে তা বাতাস চলাচলের জন্য উপযোগী হয়।
সানস্ক্রিন ব্যবহার
সকালে স্কুলে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে বাচ্চাদের শরীরের উন্মুক্ত অংশে সানস্ক্রিন লাগিয়ে দিতে হবে। কিশোর বয়সীদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়েদেরকে তাদের সন্তানকে সানস্ক্রিন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ছোট থেকে অভ্যাস করানো হলে কিশোর বয়সীরা নিজেরাই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে শিখে যাবে। এই অভ্যাস কার্যকর করার জন্য প্রতিবার ঘর্মাক্ত হওয়ার দুই ঘণ্টা পরপর সানস্ক্রিন প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া স্কুলের খেলাধুলার পর বাচ্চাদের সানস্ক্রিন প্রয়োগ করতে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
একটি গলফ বলের মাপের সমান বা প্রায় ২৮ গ্রাম সানস্ক্রিন পুরো শরীরে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে শরীরের যে অংশগুলো সাধারণত এড়িয়ে যায় সেগুলোতে বেশি নজর দেওয়া উচিত। যেমন- কানের পিছনে, ঘাড়ে, হাত ও পায়ের উল্টো পিঠের অংশগুলো।
ছাতা ব্যবহার
স্কুলে যাওয়া ও আসা নিয়ে প্রতিদিনি বাচ্চাদের একটি উল্লেখযোগ্য সময় রোদের আলোয় কাটাতে হয়। এই সময়টিতে শুধুমাত্র সানস্ক্রিনের উপর নির্ভর করাটা যথেষ্ট নয়। সূর্যালোক প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরিধান ছাড়াও এ সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ছাতা ব্যবহার করা। খুব নান্দনিক এবং রঙচঙা নয়, এক্ষেত্রে খেয়াল দিতে হবে ছাতাটি রোদ থেকে কতটা ছায়া দিতে পারছে তার উপর। মুষলধারে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে যেভাবে ছাতা ব্যবহার করা হয়, এক্ষেত্রেও একই কাজ করা উচিত। আর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের এই অভ্যাস তৈরিতে আদর্শ হতে পারে পিতামাতা ও পরিবারের অন্যান্য প্রাপ্ত বয়স্করা।
ঘর ঠান্ডা রাখা
গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে ঘরে থাকতে হলে সেই ঘরকেও রাখতে হবে তাপমুক্ত। কেননা বাইরে থেকে রোদের আলো ঘরে ঢুকে অথবা ঘরের দেয়াল রোদ শুষে নিয়ে ঘরকে উত্তপ্ত করে তোলে। এ অবস্থা থেকে শতভাগ মুক্তি না মিললেও সম্ভাব্য কার্যকর উপায়গুলো অবলম্বন করা যেতে পারে।
যেমন; হলুদ এবং হ্যালোজেন বাল্বগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। তাই এগুলোর বদলে ব্যবহার করতে হবে এলইডি লাইট, যা ঘর ঠান্ডাও রাখে আবার বৈদ্যুতিক খরচের দিক থেকেও বেশ সাশ্রয়ী।
দিনের উত্তপ্ত সময়গুলোতে জানালার পর্দা টেনে দিতে হবে। জানালা বন্ধ রাখা হলে সূর্যালোকের ঘরের ভেতর ঢুকতে আরও একধাপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। ঠিক সন্ধ্যার দিকে পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে দিলে বাইরের ঠান্ডা বাতাস ভেতরে প্রবেশ করবে। এতে করে দিনের বেলা বাইরের গরম বাতাস ভেতরে আসবে না। রাতভর ঘরের ভেতর জমা হওয়া ঠান্ডা বাতাস দিনের বেলা বাইরে যেতে পারবে না।
বেশি বেশি পানি পান
পানিশূন্যতার মত গরম আবহাওয়ার ফলে সৃষ্ট নানা ধরনের রোগ বালাই থেকে বাঁচতে পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। স্কুল বা বাড়ি যেখানেই থাকুক না কেন, বাচ্চাদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার সময় নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি বিরতি দিতে হবে। এমনকি তারা তৃষ্ণার্ত না থাকলেও চালিয়ে যেতে হবে এই কার্যক্রম। বেশি বেশি পানি পান শুধু পানিশূন্যতাই প্রতিরোধ করে না, বাচ্চাদের দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকিও কমাতে পারে।
পানিশূন্যতা রোধকারী ফল ও সবজি খাওয়া
গ্রীষ্মের খরতাপ থেকে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সেরা উপায় হচ্ছে সর্বাধিক পানি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। এক্ষেত্রে গ্রীষ্মকালীন ফল তরমুজ একটি উৎকৃষ্ট খাবার কেননা এতে রয়েছে ৯১% পানি। এছাড়া অন্যান্য ফল-ফলাদির মধ্যে রয়েছে আঙ্গুর, আপেল, চেরি, কমলা, এবং আনারস। এগুলো সরাসরি অথবা জুস বানিয়ে কিংবা সালাদ করেও খাওয়া যায়।
তরকারির মধ্যে রয়েছে পালং শাক, টমেটো, শসা, মুলা, ফুলকপি, গাঁজর, পুদিনাপাতা, পেঁয়াজকলি, ঢেঁড়শ এবং লাউ।
প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই ফল এবং শাকসবজি থাকা মানে যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন পাওয়া। এই পুষ্টি উপাদান পানিশূন্যতা রোধের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেও সহায়তা করে।
প্রতিদিন গোসল
স্কুল বা যেকোনো উপলক্ষে বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পরপরই গোসল করা একটি স্বাস্থ্যবিধি। এমনকি এটি একাধিকবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা যখন গোসলের পানি বাচ্চার ত্বকে ভিজিয়ে দেয়, তখন শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর কার্যকলাপের জন্য নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় থাকে। এই পরিমিত তাপমাত্রাতেই রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে শরীরকে সতেজ করে তোলে।
তবে গোসলের সময় আরামদায়ক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করা উচিত। খুব গরম বা খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা যাবে না। এভাবে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত গোসলে অভ্যস্ত হলে উত্তাপজনিত অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে পারে।
মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে চলা
রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় পারতপক্ষে সর্বদা অতিরিক্ত ভিড়গুলো এড়িয়ে চলতে হবে। যেকোনো ভিড়ে প্রতিটি মানুষের দেহের তাপ একত্রিত হয়ে সেখানকার পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তোলে। এই বিষয়টি এমনকি এক জায়গা একসঙ্গে অনেকজন শিক্ষার্থী থাকাটাও ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে ক্লাসরুমের, স্কুল ভ্যান বা গাড়ির প্রশস্ততা বিবেচনায় আনা আবশ্যক।
এছাড়া যানজটের মধ্যে ইঞ্জিন চালুরত গাড়িগুলো থেকেও উত্তাপের সৃষ্টি হয়। আর এরকম পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বাচ্চাকে নিয়ে হেঁটে যাওয়াটাও অস্বাস্থ্যকর।



