প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে একটি 'অনুকূল ও সহায়ক পরিবেশ' তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে নয়াদিল্লির সামনে দুটি সুনির্দিষ্ট শর্ত তুলে ধরেছে বাংলাদেশ সরকার। সফর প্রক্রিয়ার অগ্রগতির আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেন মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম।
মুখপাত্র লিখিত বক্তব্যে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও দিল্লির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছিল। তবে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করার ঘটনায় কূটনৈতিক সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত ও কলুষিত হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ ত্বরান্বিত করা এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের হস্তান্তরের জন্য আমরা ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা এখন তাদের ইতিবাচক প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় রয়েছি।"
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি জানিয়েছেন, তারা তাঁদের প্রতিষ্ঠিত আইনি পদ্ধতি অনুযায়ী বিষয়টির পর্যালোচনা করছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী এই বিষয়টি মূল্যায়ন করা হবে। প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নয়, বরং আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদসহ তিন আসামিকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ের ভারতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় হস্তান্তরে কিছু বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গত ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর পরপরই ভারতীয় গণমাধ্যম আগামী ২২-২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সম্ভাব্য দিল্লি সফরের তথ্য প্রকাশ করেছিল, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানাদিক নিয়ে বৈঠকের কথা ছিল। তবে ঢাকা এখন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও হাদি হত্যার আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়ে জোরালো শর্ত তোলায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অনিশ্চয়তায় পড়ল কি না, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি।
মুখপাত্র শহীদুল করিম পুনর্ব্যক্ত করেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির আলোকে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক কল্যাণের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে ঢাকা।



