Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের দু’টি সন্তান’, যা বললেন রুমিন ফারহানা

আওয়ামী লীগ-জামায়াত পুরোনো বন্ধু বলে তিনি দাবি করলেও অতীতে বিএনপি-জামায়াতকে একই মায়ের দু’টি সন্তান বলেছিলেন

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০২:৩১ পিএম

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক। ভাষা সৈনিক অলি আহাদের কন্যা। ব্রিটেনে আইন বিষয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিএনপির রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ততা। চলমান জাতীয় সংসদে দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য পদ থেকে দলীয় সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করেছেন।

আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে তিনি দলটির প্রার্থী হওয়ার সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

সমসাময়িক বিষয়ে টেলিভিশন টক শো এবং সভা-সমাবেশে সরকারবিরোধী বলিষ্ঠ বক্তব্যের কারণে এই বিএনপি নেত্রীর রয়েছে আলাদা পরিচিতি।

এদিকে, গত ১০ জুন দীর্ঘ এক দশক পর ঢাকায় প্রকাশ্যে সমাবেশ করেছে বিএনপির একসময়ের প্রধান জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক-শোতে দলটির সঙ্গে সরকারের যোগসূত্র থাকার কথা দাবি করেন রুমিন ফারহানা। 

তার ভাষ্য, “আওয়ামী লীগ-জামায়াত পুরোনো বন্ধু। জামায়াতের ১৮-২০টি আসন না পেলেও ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসত।”

এ বক্তব্যের পরপরই জামায়াত নিয়ে তার একটি পুরনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে রুমিনকে বলতে শোনা যায়, “বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের দু'টি সন্তান। দু'টি ভাই। আর দু'ভাইয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব হতে পারে না। মান-অভিমান হতে পারে।”

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, তার এই বক্তব্যটি ১২ বছর আগে লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া। সেটি ছিল তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে। 

তবে জামায়াতের সাম্প্রতিক কার্যক্রম কিংবা বর্তমানে তাদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

রুমিন বলেন, “বিএনপি এখন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনেই এগিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে আগামীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি'র সম্পর্ক কেমন হয়, তা সময়ই পরিষ্কার করবে।”

জামায়াত নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্য

১০ জুন জামায়াতের সমাবেশের পর টেলিভিশন টক-শোতে বিএনপির সঙ্গে ধর্মভিত্তিক দলটির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, “জামায়াত আওয়ামী লীগের পুরনো বন্ধু। ১৯৮৬ সালের পর এককভাবে আন্দোলন করেই এরশাদের পতন ঘটিয়ে ৯১ সালে সরকার গঠন করে বিএনপি। ২০২১ সালে জামায়াতের ১৮-২০টি আসন না পেলেও বিএনপি ক্ষমতায় আসত। বর্তমানে বিএনপি একাই চলছে এবং একাই শক্তিশালী দল। তবে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে কেউ আসতে চাইলে বিএনপি স্বাগতম জানাবে।”

“তার মানে এই নয় যে, বিএনপি কাউকে ছাড়া চলতে পারবে না। জামায়াতকে নিয়ে পুরোটা সময় খেলেছে আওয়ামী লীগ। দলটি তাদের পুরোনো বন্ধু। বিশেষ করে ৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯৪-৯৬ সালে যুগপৎ আন্দোলনসহ জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য বহু পুরোনো।

নানা দোষ-ত্রুটিতে ধরা পড়ে মাঝখানে দলটির সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক খারাপ হলো। মূলত ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে সরকার গঠনের পর থেকেই জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক খারাপ হয়। জামায়াত নিষিদ্ধের একটি কথা কিন্তু বাজারে প্রচলিত আছে দীর্ঘদিন। তা আওয়ামী লীগই ছেড়েছে। বলা হচ্ছে জামায়াত নিষিদ্ধ হচ্ছে, হবে।”

রুমিন বলেন, “২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জামায়াত নিষিদ্ধ করতে সরকার প্রস্তুত। কয়েকদিন পরই (১১ ফেব্রুয়ারি) আইনমন্ত্রী জানালেন, জামায়াত নিষিদ্ধ নয়, আপিল বিভাগে দলটির নিবন্ধন সংক্রান্ত মামলা চলছে। আর ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশের পর তিনি জানালেন চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত দলটিকে নিষিদ্ধ বলা যাবে না।”

“অন্যদিকে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বললেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”

রুমিন ফারহানার মতে, দীর্ঘ ১০ বছর পর সরকারের এ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে প্রধান দুটি কারণ হলো- বিএনপি ভোটে না এলে হয়তো জামায়াতসহ আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে নির্বাচন করিয়ে দেখাতে চাইবে ভোট অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। আরেকটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বহির্বিশ্বকে বোঝানো- দেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। আওয়ামী লীগ না থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”

তার অভিযোগ, “জামায়াতকে মুঠোয় রাখাসহ আগামীতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সরকার যা খুশি তাই করছে। অথচ হরকাতুল জেহাদ ও হিযবুত তাহরীরকে এক কলমের খোঁচায় নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। আর জামায়াত ইস্যুটি জিইয়ে রেখেছে।”

জামায়াত নিয়ে ইতোপূর্বে দেওয়া বক্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সাথে জামায়াতের এক ধরনের যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করলেও ইতোপূর্বে দলটিকে  নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বক্তব্য দিয়েছেন এ বিএনপি নেত্রী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে জামায়াতের পক্ষে তিনি অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

একটি ঘরোয়া বৈঠকে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমার এক ভাই প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি-জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমি বিনীতভাবে বলতে চাই, বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য ইসলামি দলগুলো এক মায়ের দুই সন্তান। দুই ভাই। আর দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব হতে পারে না। মান-অভিমান হতে পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা যাকে দূরত্ব, ডিফারেন্স, মতান্তর বা গ্যাপ বলি, তা হতে পারে। কিন্তু আবারও আমরা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারি।”

“এসব বিষয়ে আমরা বসব ও আলাপ করব। ওনারা কী বলতে চান আমরা শুনব এবং বিএনপি কী বলতে চায় ওনারা শুনবেন। দুই ভাই একত্রে বসলে কোনো কিছুতে একমত হতে পারে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ আমাদের কমন অউন একটা, কমন এজেন্ডা একটা ও কমন শত্রু একটা।

তাই আমাদের মধ্যে দূরত্ব হতে পারে না। মতান্তর হতে পারে। কিন্ত এক সময় ঐক্যমতে পৌঁছতে পারবই।”

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি তার বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “জামায়াত ও বিএনপি সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক দল। সময়ের দাবি অনুযায়ী হয়ত দলীয় হাইকমান্ডকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জামায়াত নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তার ব্যক্তিগত। শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে বিএনপি।”

সরাইল উপজেলা জামায়াতের আমির মনিরুজ্জামান বলেন, “এ সরকারের অধীনে ভোটে যাবে না আমাদের দল। আর জামায়াত নিয়ে রুমিন ফারহানা কী মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। সময়েই সব পরিষ্কার হবে। আপাতত আমরাও সরকার পতন আন্দোলনে এগোচ্ছি।”

সরাইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিছুল ইসলাম ঠাকুর বলেন, “বিএনপি একটি স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি। কোনো বিশেষ দলের কারণে সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে থাকবে না।”

জামায়াত নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।

যা বললেন রুমিন ফারহানা

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় বিএনপি'র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে।

ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, যেকোনো বিষয়ে তিনি বক্তব্য দেন সময়ের চাহিদার আলোকে।

“যেহেতু রাজনীতি করি, সেহেতু দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে অনেক কথাই বলতে হয়। বর্তমানে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন করছে বিএনপি।”

“জামায়াত-বিএনপি একই মায়ের দুই সন্তান,”- এ বক্তব্যের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “১২ আগে লন্ডনে একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে এমনটি বলেছিলাম। হয়ত তখন পরিবেশ ছিল এক রকম। সাম্প্রতিক সময়ে যা বলেছি, এখনকার বাস্তবতা হয়ত তাই।”

জামায়াতের সঙ্গে আগামীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সম্পর্ক কেমন হতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে বলে মনে করেন এই বিএনপি নেত্রী।

About

Popular Links