ভারত সফররত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) একটি বিজ্ঞপ্তি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়।
এই সংবাদটিকে “ভুয়া” দাবি করেছেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলছেন, “গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এভাবে কারও চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই।”
গত ২০ আগস্ট ভারত সফরে যান জি এম কাদের। এর আগের দিন ১৯ আগস্ট রওশন এরশাদ গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর রওশন এরশাদ বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর তিন দিনের মাথায় রওশন এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলো।
সংবাদমাধ্যমে পাঠানো রওশন এরশাদের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “আমি বেগম রওশন এরশাদ, এমপি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান এই মর্মে ঘোষণা করছি যে পার্টির সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে ও সিদ্ধান্তক্রমে দলের গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।”
এই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সই করেছেন।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সংবাদমাধ্যম আমাদের সময়কে বলেন, “এই খবরটি ভুয়া। আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এভাবে কারও চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া যাদের সই করার কথা বলা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তারা বলছে, তাদের ব্ল্যাকমেল করা হয়েছে। গত বছর রওশন এরশাদ চিকিৎসা শেষে যখন দেশে এসেছিল তাকে দেখতে গিয়েছিলেন, তখন এসব সই নেওয়া হয়েছিল। কোনো সভায় তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেনি।
একই সংবাদমাধ্যমকে রওশন এরশাদ বলেন, “যারা প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে তাদের জিজ্ঞাসা করেন। তারা বিস্তারিত বলতে পারবেন। আপনারা রয়ে-সয়ে নিউজ করেন।”
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, জাতীয় পার্টিতে দুই শীর্ষ নেতার বিরোধ তত বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় পার্টির ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে। আর জি এম কাদের বেশ কিছুদিন ধরে সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়ে আসছেন।
এরশাদ জীবিত থাকাকালীন দলটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: একটি এরশাদপন্থি এবং অন্যটি রওশনপন্থি। এরশাদের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা জি এম কাদেরপন্থি হিসেবে পরিচিতি পায়।
২০১৯ সালের ৪ মে জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এইচ এম এরশাদ। এরপর থেকে বিরোধ বাড়তে থাকে। রওশন এরশাদের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় দলের মধ্যে বিরোধ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মসিউর রহমানকে জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে জি এম কাদের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেন। এরপর তিনি দলের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বিষোদ্গার করলে সে বছরের ৮ অক্টোবর দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও অব্যাহতি পান মসিউর।
মসিউর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়ার তিন দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় জাপার আরেক নেতা জিয়াউল হক মৃধাকে। এ আদেশের বিরুদ্ধে তিনি ৪ অক্টোবর ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন। মামলায় জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈধ ঘোষণার আবেদন করেন তিনি। ৩০ অক্টোবর আদালত জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরকে দলীয় কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন।
এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের দায়িত্ব পালনের ওপর নিম্ন আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞাদেশ স্থগিত করেন হাইকোর্ট।
এবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবারও নেতৃত্ব সংকটের দিকে দলটিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



