Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বরফ সত্যিই কি গলছে?

বিএনপিও বিভিন্ন সময় ভারতীয় পণ্য বয়কটের আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৪ পিএম

দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপি বিভিন্ন সময় ভারতীয় পণ্য বয়কটের আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছে। তবে সেই টানাপোড়েন এখন কমে আসছে অনেকটাই। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় এ বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তা করছে ভারত। একইসঙ্গে বিএনপিও ইতিবাচক। বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি বিএনপির সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মার বৈঠকের পর। তবে কতটা বরফ গলেছে তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও দলটির নেতারা বলছেন, ভারতকে কখনোই তারা শত্রু ভাবেননি। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারতীয় একটি গণমাধ্যমকে সম্প্রতি জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে তাদের যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল সেই বরফ গলতে শুরু করেছে। এই সম্পর্ক আরও ভালো হবে। কূটনৈতিক অঙ্গনে কাজ করেন বিএনপির এমন একাধিক শীর্ষ নেতা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গত দেড় যুগের বেশি সময় ধরে ভারত তাদের সম্পর্ক শুধু একটি দলের সঙ্গে জোরদার করেছে। তবে বিএনপির হাইকমান্ডের প্রত্যাশা ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর এখন ভারত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে এবং সেটি হলে সবপক্ষের জন্যই ভালো।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “বাংলাদেশে গত নির্বাচনের পর থেকেই আমাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এবার আমাদের অফিসে হাইকমিশনার (ভারতের) আসায় অবশ্যই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বরফ গলতে শুরু করেছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সবসময়ই খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। অবশ্যই এটি টার্নিং পয়েন্ট।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা পানি ভাগাভাগি সমস্যা, সীমান্ত হত্যা, বিদ্যমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার কথা উল্লেখ করেছি। একই সময়ে, ভারতের প্রধান ইস্যু ছিল নিরাপত্তা সমস্যা। আমরা আশ্বস্ত করেছি, আমরা ক্ষমতায় থাকলে, আমরা নিশ্চিত করব—এ ভূখণ্ডটি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ব্যবহার করবে না।”

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়লে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করে। এরপর ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক এগোতে থাকে এবং বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়, যা বিভিন্ন সময় প্রমাণও মিলেছে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি একতরফা এবং ভোটারবিহীন নির্বাচন করে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তার মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ অন্যরা বর্জন করে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নিলেও তা বেশ বিতর্কিত ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিও অনুষ্ঠিত ভোটেও জাতীয় পার্টি ও নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে ভোট করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। বিএনপিসহ বিরোধী নেতাদের অভিযোগ—প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ভারতের প্রচ্ছন্ন ইন্ধন ও প্রভাব ছিল। 

মূলত, ২০০৬ সালে দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা বিএনপিকে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে ভারত। ভারতের সেভেন সিস্টার্স বলে খ্যাত নর্থ-ইস্ট অঞ্চলে এই অস্ত্র ভারতীয় বিদ্রোহীদের কাছে যাচ্ছিল বলে ওই সময়ে খবর ছড়ায়। যা নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয় ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে। তবে বিএনপি মনে করে, এসব কিছুই তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। ভারত বিরোধী তৎপরতার সঙ্গে বিএনপি কখনই জড়িত ছিল না। বিএনপির হাইকমান্ড সবসময় মনে করে, বিএনপির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় থাকলে আমাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুসংহতসহ এ অঞ্চলে কোনো অপশক্তিই কিছু করতে পারবে না।

তবে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বদলে গেছে দৃশ্যপট। এখন বিএনপি এবং ভারত-দুপক্ষই চায় সুসম্পর্ক এগিয়ে নিতে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতির কোনো কারণ নেই। প্রতিবেশী সবার সঙ্গেই তো আমাদের ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ভারত তার বাইরে নয়। আমরা শুধু ভারত নয়, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ এবং মিউচুয়াল বেনিফিট থাকতে হবে। এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ না করা। এগুলোই তো সম্পর্কের ভিত্তি।”

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি ভারত বিরোধী-এমনটা অপপ্রচার। বিএনপি তার জনগণের জন্য রাজনীতি করে। জনগণের জন্য মঙ্গলজনক সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় বিএনপি।”

ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। আমরা চাই তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। তবে এই সম্পর্কটা হবে সমতার ভিত্তিতে, সহমর্মিতার ভিত্তিতে। তবে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি পাল্লায় রেখেছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল। সেখান থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে।"

ভারতের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “ভারতের কাছে আমাদের প্রথম দাবি সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুয়ায়ী পানির যে হিস্যা সেটা আমাদের দিতে হবে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কিছু বৈষম্য আছে সেটাকে কমিয়ে আনতে হবে। তবেই আমরা তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে পারি। এখানে ভারতেরও একটা ইস্যু রয়েছে, সেটা হলো, সেভেন সিস্টার্স। আমরা ভারতকে আশ্বস্ত করতে চাই বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে কেউ ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারবে না। সেটি আমাদের মহাসচিব ইতোমধ্যে বলেছে। আমরা ন্যায়্যতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক জাহাঙ্গীর সুর বলছেন, বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে ভারত। চাইলেও এই প্রতিবেশী বদল সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে ভারতের বাংলাদেশের যেমন ভারতকে ছাড়া চলা মুশকিল। আবার ভারতের নর্থইস্টের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের মধ্যেও স্থিতিশীলতা জরুরি। সেজন্য বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গেই ভারতে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোরও বৈরি আচরণ করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে বিএনপি যেহেতু রাজনৈতিক শক্তি, তাদের যেমন দায়িত্ব আছে; ভারতেরও উচিত এখানকার জনগণের প্রতিনিধি যেই হোক তার সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া। এতে করে দুই পক্ষই লাভবান হবে।

   

About

Popular Links

x