ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশ না নেওয়ার পেছনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্ত ছিল বলে জানিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তৎকালীন সরকার ও আসিফ নজরুল দায়ী।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) ড. এ কে এম অলি উল্যার নেতৃত্বে তিন সদস্যের এ কমিটিতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর এবং সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, “সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি মনে করেছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের সরকার দায়ী।“
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল।“
তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটি আসিফ নজরুলের হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবিকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। তিনি এখনো একই দায়িত্বে রয়েছেন।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানান, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি মূলত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবেই বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম অলি উল্যা বলেন, “সিদ্ধান্ত একজনের মাধ্যমে এলেও সেটিকে একজনের সিদ্ধান্ত বলা যায় না; এটি ছিল সরকারের সিদ্ধান্ত এবং সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে কর্মকর্তাদের যাওয়ার সুযোগ নেই।“
সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল কি না এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
২২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে ১২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জাতীয় দলের ক্রিকেটার, বিসিবির কর্মকর্তা, সাবেক ক্রিকেট সংগঠক এবং ক্রীড়া সাংবাদিকরা রয়েছেন।
ক্রিকেটারদের মধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর। ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ছিলেন বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং বিসিবির পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেছে তদন্ত কমিটি।
তবে বিশ্বকাপ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সে সময়ের বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কমিটি।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার ঘটনা ঘটে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর।
আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সে সুযোগ পাওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেটে তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভারত সফর করে বিশ্বকাপে অংশ না নিয়ে পাকিস্তানের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ চেয়েছিল। তবে আইসিসি সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারায় এবং তাদের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করে শাস্তির সুপারিশ করেনি। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে।
১. রাজনীতি থেকে ক্রিকেটকে আলাদা রাখা
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে বিসিবির একটি আনুষ্ঠানিক নীতি প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
২. বিসিবির স্বাধীনতা জোরদার করা
সরকার, বিসিবি ও খেলোয়াড়দের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে কার কী দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব তা স্পষ্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৩. সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা
ভবিষ্যতে সংকটের সময় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এড়াতে একজন নির্ধারিত মুখপাত্র এবং স্বচ্ছ যোগাযোগ কৌশল রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।
৪. খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া
নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখা দিলে স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে সেই তথ্য খেলোয়াড়, আইসিসি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।



