চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রোগী শনাক্তে চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে সন্দেহজনক রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠাতে হচ্ছে। এতে রোগ শনাক্তে সময় লাগার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
অথচ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) হাম শনাক্তের সক্ষমতা থাকা পরীক্ষাগার রয়েছে। তারপরও স্থানীয়ভাবে নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় ঢাকানির্ভর হতে হচ্ছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগকে।
চট্টগ্রামে হামে ৭ হাজার ৯৪১ জন আক্রান্ত এবং ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন উপসর্গ নিয়ে এবং তিনজনের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে আরও ৭০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চট্টগ্রামে মোট ৭ হাজার ৯৪১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এর মধ্যে মহানগরে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৬৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে মহানগরে মোট ৭ হাজার ৫৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৫টি উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় একজনসহ মোট ৩৬২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চট্টগ্রামে হামে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন উপসর্গ নিয়ে এবং তিনজনের পরীক্ষায় হাম শনাক্তের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সংস্থাটি জানিয়েছে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৬০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার এনপিএমএল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে নগরের ১ হাজার ৬৪৫ জন এবং জেলার বাসিন্দা ৩১৫ জন। পাঠানো নমুনার মধ্যে বেশিরভাগ রিপোর্ট চলে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘‘চট্টগ্রামে বর্তমানে ল্যাবে হাম রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে না। হামের পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকরা উপসর্গ দেখলেই হাম কিনা বুঝতে পারেন। তবে সরকারের সিদ্ধান্তে উপসর্গ নিয়ে কেউ চিকিৎসার জন্য এলে তাকে হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘যারা পরীক্ষা করাতে চান সেসব রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট চলে আসছে।’’
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন জানান, আমার তিন মাস বয়সী মেয়ের হামের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে গেল মাসের শেষের দিকে একটি বেসরকারি ল্যাব থেকে পরীক্ষার নমুনা দেওয়া হয়। তারা নমুনা পাঠায় ঢাকায়। ফি নেওয়া হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। রিপোর্ট পেতে সময় লেগেছে এক সপ্তাহ।
তিনি জানান, আমার মেয়ের শরীরে হামের উপসর্গ থাকলেও চিকিৎসক পুরোপুরি হামের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি। এ কারণে পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়া হয়। হামের পরীক্ষা ব্যয়বহুল। চট্টগ্রামে এ পরীক্ষা না থাকায় রিপোর্ট পেতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে।
নগরের কোতোয়ালী থানাধীন জামালখান এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জানান, দেশের দ্বিতীয় জনবসতিপূর্ণ নগরী চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনেও হামের পরীক্ষা চালু করা যায়নি। অথচ প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বাইরেও বিপুল সংখ্যক মানুষ উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
২০১৩ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) হাম ও রুবেলাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এ হাসপাতালে অত্যাধুনিক রিয়েল-টাইম পিসিআর মেশিন এবং অ্যালাইজা মেশিন রয়েছে। এ ছাড়া যক্ষ্মা শনাক্তে জিন এক্সপার্ট, রক্ত পরীক্ষার জন্য অটোমেটেড অ্যানালাইজার মেশিনসহ বিশ্বমানের ‘রডলফ মেরিয়ো ল্যাবরেটরি’র সুবিধাও এখানে রয়েছে।
বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘‘রোগীর উপসর্গ দেখেই চিকিৎসকরা হাম শনাক্ত করতে পারেন। কেননা হাম একটি পরিচিত এবং পুরাতন রোগ। হামের প্রধান তিনটি লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বেশি মাত্রায় জ্বর, কাশি এবং শরীরে র্যাশ থাকা। সাধারণত হাম রোগীদের র্যাশ মুখ এবং কান দিয়ে শুরু হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে এসব লক্ষণ দেখা গেলে বোঝা যায় তার শরীরে হাম হয়েছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বিআইটিআইডি হাসপাতালের ল্যাবে হাম পরীক্ষা সম্ভব। তবে হাম-রুবেলা পরীক্ষার জন্য কিট নেই। কিটের জন্য ঢাকায় চিঠি লেখা হয়েছিল। কিট এবং অনুমোদন পেলে পরীক্ষা শুরু করা যাবে।’’



