Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেই নারী নেতৃত্ব

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া ক্রীড়াঙ্গনে এ বৈষম্যের পরিবর্তন হবে না

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৩, ০২:২৬ পিএম

বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াঙ্গনে নারী ক্রীড়াবিদদের সাফল্যের গল্প বাড়ছে। কিন্তু ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনসহ ক্রীড়া বিষয়ক ৫২টি ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষস্থানীয় পদে বর্তমানে কোনো নারী নেই।

দেশের এসব ক্রীড়া পরিচালনা সংস্থাগুলোর সাধারণ সম্পাদক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতো পদের মধ্যে একজন নারী থাকলেও সভাপতির পদে রয়েছে পুরুষরাই। এমনকি কার্যনির্বাহী কমিটিগুলোও স্পষ্টভাবে পুরুষপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া ক্রীড়াঙ্গনে এ বৈষম্যের পরিবর্তন হবে না।

যথেষ্ট সুযোগের অভাব

ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, আর্চারি, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, শুটিং, কাবাডি, ভলিবল, ভারোত্তোলন, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, হ্যান্ডবল, গলফ, জিমন্যাস্টিকস, বাস্কেটবল, সাইক্লিং, রাগবি, বক্সিং, কারাতে, তায়কোয়ান্দো, রোয়িং, বডি বিল্ডিং, সেতু, ফেন্সিং এবং সার্ফিং- সব খেলার ফেডারেশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদে পুরুষ।

শুধুমাত্র জুডোর ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একজন নারী রয়েছেন, যার নাম কামরুন নাহার হিরু (৬০)। তিনি ১৯৮১ সালের ৪র্থ এশিয়ান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি নারী ক্রীড়াবিদের আন্তর্জাতিক পদক জয়ের নজিরও সেটি।

গত বছর ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া কামরুন নাহার হিরু ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি সংগ্রাম করতে হয়। আমি অনেক দিন ধরে যুদ্ধ করছি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হেরে গিয়ে অবাক হয়েছিলাম। তবে আমি কখনও হাল ছাড়িনি। আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম।”

অন্যান্য ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদে কেন কোনো নারী নেই জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা নির্বাচন ও বাছাইয়ের মাধ্যমে হয় (এনএসসি কর্তৃক গঠিত অ্যাড-হক কমিটি)। নারী কাউন্সিলরদের [ভোটার] সংখ্যা খুবই কম। এটিই অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা সুযোগ পান না। পারিবারিক অবস্থাও পক্ষে না থাকতে পারে। পুরুষশাসিত সমাজে তারা অনেক বাধার সম্মুখীন হয়।”

কামরুন নাহার হিরু

কামরুন নাহার হিরু জানান, জুডো ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটিতে ৭ জন মহিলা সদস্য রয়েছে, যা অন্যান্য ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

একচেটিয়া এবং বিতর্ক

রেকর্ড ১৬ বারের জাতীয় টেবিল টেনিস শিরোপাজয়ী, জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী এবং খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ জোবেরা রহমান লিনুর অভিযোগ, টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তাকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছে।

জোবেরা রহমান লিনু বর্তমানে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) অ্যাথলেট কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “আমি সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মাত্র ৬ মাস পরেই তড়িঘড়ি করে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। আমি আর কখনও চেষ্টা করিনি।”

কিংবদন্তি এ ক্রীড়াবিদ আরও বলেন, “নির্বাচনের সময় এমন একচেটিয়া ঘটনা ঘটে। যারা সক্ষম তারা বের হওয়ার দরজা দেখে। এটা একটা খেলার মতোই। পুরো প্রক্রিয়াটি নষ্ট হয়ে গেছে। নারীরা সর্বদা নির্যাতিত হয়।”

জোবেরা রহমান লিনু
এছাড়া, কোনো যথোপযুক্ত কারণ দেখানো ছাড়া তাকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বাদ দেওয়ার জন্যও সাইক্লিং ফেডারেশনকে দায়ী করেছেন জোবেরা রহমান লিনু।


সাবেক ক্রিকেটার ও হকি খেলোয়াড় পারভিন নাসিমা নাহার পুতুল বলেন, “প্রবীণ নারী সংগঠক এবং সাবেক ক্রীড়াবিদরা দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলায় নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর লড়াই করে চললেও সফলতার দেখা পাননি।”


৬৬ বছর বয়সী পারভিন নাসিমা নাহার পুতুল একাধারে ক্রিকেট প্রশিক্ষক এবং হ্যান্ডবল রেফারি ছিলেন। সত্তরের দশকে ক্যারিয়ার শুরু করা এ নারী বর্তমানে একজন সক্রিয় সংগঠক।

পারভিন নাসিমা নাহার পুতুল

তিনি বলেন, “সমাজে নারীদের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করার জন্য অনেক অভিজ্ঞ নারী যোগ্য হলেও সুযোগ পান না। কাউন্সিলর অথবা ভোটারদের তালিকার মতো এখানেও যোগ্য নারীরা অবহেলিত।”

সংবিধান পরিবর্তনের আহ্বান

জাতীয় ব্যাডমিন্টন এবং টেবিল টেনিস খেলোয়াড় এবং বিখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক কামরুন নাহার দানা (৬৩) জানান, তার জানামতে শুধুমাত্র অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। তবে সেটা কত, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।

২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় সর্বশেষ অ্যাথলেটিকস নির্বাচনের ফলাফল থেকে জানা যায়, বর্তমান কমিটিতে ২৯ জন সদস্যের মধ্যে তিনজন নারী রয়েছেন। অধিকাংশ ফেডারেশনের ক্ষেত্রে একই চিত্র। আবার কিছু ক্রীড়া সংস্থায় একজনও নারী প্রতিনিধি নেই।

সব ফেডারেশনের বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে দানা বলেন, “সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে। প্রত্যেক ফেডারেশনে একই আইন প্রয়োগ করা দরকার কারণ অন্যরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের সুযোগ দিচ্ছে না। প্রতিটি খেলায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং তাদের ফলাফলও প্রশংসনীয়। আগের তুলনায় সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও কমেছে। সাংগঠনিক ভূমিকায় আরও বেশি নারীর প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।”

কামরুন নাহার ডানা

২০০৩ সালে ফুটবল ফেডারেশনের প্রথম নারী উইং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ডানা। দেশে নারী ফুটবল প্রবর্তনের সময় মৌলবাদীদের অবস্থানের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে লড়াইও করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি ক্রিকেট বোর্ডের মহিলা কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান এবং নারী ক্রীড়া সংস্থার তিনবারের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৯৯ সালে খেলোয়াড় এবং সংগঠক হিসেবে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার জিতেছিলেন।

কামরুন নাহার ডানা বলেন, “ফেডারেশনে যদি আরও নারী কর্মকর্তা এবং সংগঠক থাকে, তাহলে নারী ক্রীড়াবিদরা আত্মবিশ্বাসী হয়। তাদের অভিভাবকরাও এতে স্বস্তিবোধ করেন। অনেক নারী ক্রীড়াবিদই অবসরের পরে কোচ, রেফারি বা সংগঠক হতে চান। কিন্তু তারা খুব একটা সুযোগ পান না। কর্তৃপক্ষও সাবেক নারী খেলোয়াড়দের ব্যবহার করে না।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা নারী অধিকারের কথা বললেও খেলাধুলায় কিন্তু তা নেই। প্রতিটি ফেডারেশনে কমপক্ষে ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে এবং আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এ কারণে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং এনএসসিকে এগিয়ে আসতে হবে।”

খেলাধুলায় পুরুষ ও নারীদের মধ্যে বৈষম্য দূর করার জন্য ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং এনএসসির হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে অভিমত হিরু, লিনু এবং পুতুলের। নারী ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মাহাবুব আরা বেগম গিনি এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজা করিম নেলীর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা

ক্রিকেট বোর্ড এবং ফুটবল ফেডারেশন বাদে অন্যান্য প্রায় সব ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিই নির্বাচিত হয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।

বারবার চেষ্টা করেও যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী এবং এনএসসির চেয়ারম্যান জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। এমনকি তার ফোন নম্বরে পাঠানো টেক্সট মেসেজেরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ফেডারেশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা নেই উল্লেখ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমার মতামত হলো নারী প্রতিনিধি থাকা উচিত। আমি জানি না কেন এখানে এমনটা নেই। প্রক্রিয়াটা আমার জানা নেই। ফেডারেশনগুলোয় কেন এটি (নারী প্রতিনিধিত্ব) নেই তা আমি বলতে পারব না।”

   

About

Popular Links

x