ক্রিকেটে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠা খুবই সম্ভব। কিন্তু সামর্থ্যের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়েও কখনো কখনো সাফল্য হাত ফসকে যায়। দিনশেষে দলগত ব্যর্থতায় ঢাকা পড়ে যায় ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। জোটে “ট্র্যাজিক হিরো”র তকমা।
ক্রিকেটে একজন ব্যাটারের মূল কাজ রান করা। সেই ব্যাটারের ব্যাট থেকে যখন কোনো ম্যাচে শতক (সেঞ্চুরি) আসে, তখন দলের জয়ের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবুও কখনো সতীর্থ বোলারদের ব্যর্থতা আবার কখনো প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের অসাধারণ ব্যাটিংয়ে সেই সেঞ্চুরিয়ানকে পরাজিত দলে থাকতে হয়।
একই কথা বলা যায় বোলারদের ক্ষেত্রেও। ক্রিকেট যখন ক্রমশ ব্যাটিংবান্ধব হচ্ছে, তখন সীমিত ওভারের ম্যাচে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট পাওয়া সত্যিই কৃতিত্বের দাবিদার। লো স্কোরিং ম্যাচ বাদ দিলে দিনশেষে দল জয় পেলে সতীর্থ ব্যাটারদের কাছে বোলারের কীর্তি ম্লান হয়ে যায়।
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে এখন পর্যন্ত সাতজন ব্যাটার সেঞ্চুরি করেছেন। অন্যদিকে, একই মঞ্চে বল হাতে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছেন মাত্র দুজন বোলার। ক্রিকেটে সেঞ্চুরি বা পাঁচটির বেশি উইকেট শিকার নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। সেখানে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে তো এগুলো তো রীতিমতো মহাকাব্য।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এমন কীর্তি গড়েও বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয় দেখেছেন কেউ কেউ। সবটুকু উজাড় করেও বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার দুঃখ সবচেয়ে সম্ভবত দু’জন “দুর্ভাগা” খেলোয়াড়ের।
মাহেলা জয়াবর্ধনে (শ্রীলঙ্কা)
শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট ইতিহাসের সফল ব্যাটারদের তালিকা করলে সেখানে মাহেলা জয়াবর্ধনের নামটা ওপরের দিকেই থাকবে। আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মঞ্চে অবশ্য এ লঙ্কান ব্যাটারের পারফরম্যান্স বরাবরই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ক্যারিয়ারে খেলা পাঁচটি বিশ্বকাপে জয়াবর্ধনে খুব কমই ধারাবাহিক ছিলেন।
মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন জয়াবর্ধনে। সনাৎ জয়াসুরিয়া, মারাভান আতাপাত্তু, রোশান মহানামা, অরবিন্দ ডি সিলভা, অর্জুনা রানাতুঙ্গাদের মতো বাঘা বাঘা ব্যাটারদের ভিড়ে ব্যাটিং করতে হয়েছিল কিছুটা নিচের দিকে। ব্যাট হাতে কিছু করার সুযোগও তাই পাননি। গত শতাব্দীর শেষ বিশ্বকাপে মাহেলা চার ম্যাচে মাত্র ১০২ রান করেন।
২০০৩ সালে আয়োজিত বিশ্বকাপ যেন জয়াবর্ধনের জন্য আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে আসে। ব্যাট হাতে সাত ইনিংসে নেমে সর্বসাকুল্যে করতে পারেন মাত্র ২১ রান, যার মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল মাত্র ৯। একবিংশ শতাব্দীর বিভীষিকাময় প্রথম বিশ্বকাপটা তাই এই লঙ্কান ব্যাটার ভুলেই যেতে চাইবেন।
তবে আগের দুই আসরের সব অভাব ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন। চারটি হাফ সেঞ্চুরি এবং একটি শতকের সুবাদে ১১ ম্যাচে ৫৪৮ রান করে ম্যাথু হেইডেনের পেছনে থেকে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান (৫৪৮) সংগ্রাহক হন। অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েই শ্রীলঙ্কাকে ফাইনালে নিয়েছিলেন মাহেলা। ফাইনালে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট অতিমানব না হয়ে উঠলে হয়ত তিনি বিশ্বজয় করেই অমরত্ব পেতেন।
২০১১-তে শেষবারের বিশ্বকাপে নামেন জয়াবর্ধনে। আগের আসরের মতো খুনে মেজাজে না থাকলেও ব্যাট হাতে ইতিবাচকই ছিলেন মাহেলা। উপমহাদেশের মাটিতে আয়োজিত সেই আসরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে দ্বীপরাষ্ট্রটি। যে অতৃপ্তি নিয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ছাড়তে হয়েছিল, চার বছর পর উপমহাদেশে তা ঘোচানোর সুযোগ পান তিনি।
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালে অন্যতম আয়োজক শ্রীলঙ্কার প্রতিপক্ষ ছিল আরেক স্বাগতিক ভারত। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা লঙ্কানরা ভারতীয় বোলারদের দাপটে স্বস্তিতে ছিল না। দুই ওপেনার উপুল থারাঙ্গা আর তিলকরত্নে দিলশানের বিদায়ের পর ইনিংসের ১৭তম ওভারে ক্রিজে আসেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। জয়াবর্ধনে সেই যে এলেন দলের ইনিংস শেষ হওয়ার আগে আর সাজঘরে ফেরেননি। মাঝে খেলে গেছেন ৮৮ বলে ১৩টি বাউন্ডারির সহায়তায় অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংস।
অর্ধশতক পূর্ণ করতে ৪৯ বল লাগলেও সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে মাহেলার দরকার হয়েছিল মাত্র ৩৫ বল। শেষ পর্যন্ত তার অপরাজিত ইনিংসের ওপর ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ২৭৪ রানের শক্ত সংগ্রহ দাঁড় করায় শ্রীলঙ্কা। তার ইনিংসের গুরুত্ব বোঝা যাবে আরেকটি তথ্যে- মাহেলা ছাড়া আর কোনো লঙ্কান ব্যাটারই সেই ইনিংসে পঞ্চাশের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ আগের ৯টি আসরের সাতটির ফাইনালেই জিতেছে প্রথমে ব্যাট করা দল। এর মাঝে ফাইনালের পাঁচ সেঞ্চুরিয়ান ব্যাটারের সবাই ছিলেন জয়ী দলে। ইতিহাস আর রেকর্ডের বিচারে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ইনিংসের পর তাই শ্রীলঙ্কার (পড়ূন জয়াবর্ধনের) দিকেই ম্যাচের পেন্ডুলাম হেলে ছিল।
সাত ওভারের মাঝেই দুই ভারতীয় ওপেনার বীরেন্দর শেবাগ আর লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকারের উইকেট তুলে নিয়ে শ্রীলঙ্কা চালকের আসনেই উঠে বসে। কিন্তু গৌতম গম্ভীরের ৯৭ এবং ক্যাপ্টেন কুল মহেন্দ্র সিং ধোনির অপরাজিত ৯১ রানের ওপর ভর করে ১০ বল হাতে রেখেই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় ভারতীয়রা। দুই অধিনায়কের লড়াইয়ে শুধু ম্যাচসেরা আর বিশ্বকাপ ট্রফিটাই নেননি, কেড়ে নিয়েছেন মাহেলা জয়াবর্ধনের অমরত্বের সুযোগও। সেই সুবাদে জয়াবর্ধনে বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরি করেও পরাজিত দলে থাকা একমাত্র (এখন পর্যন্ত) ব্যাটার।
গ্যারি গিলমোর (অস্ট্রেলিয়া)
জয়াবর্ধনের দুর্ভাগ্যের তিন যুগ আগে ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখেছিল আরেক ট্র্যাজিক হিরোকে, যার নাম ছিল গ্যারি গিলমোর। ১৯৭৫ সালে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম আসরে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা জয়ের নায়ক হতে পারতেন এ পেসার। সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই সেই আভাস দিয়ে রেখেছিলেন গিলমোর।
শেষ চারে গিলমোরের বোলিং বিষে আগে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ড গুটিয়ে যায় মাত্র ৯৩ রানেই। ১২ ওভারে মাত্র ১৪ রানের খরচায় ৬টি উইকেট শিকার করেন গিলমোর। একদিনের ক্রিকেটে সেটাই ছিল ইনিংসে কোনো বোলারের ৬ উইকেট পাওয়ার প্রথম নজির। ৬০ ওভারে ৯৪ রানের লক্ষ্য ছোট হলেও ৩৯ রানেই অস্ট্রেলিয়ার ছয় ব্যাটারকে ফিরিয়ে সেটিকেই পর্বত সমান বানিয়ে ফেলেছিল ইংলিশ বোলাররা। শেষ পর্যন্ত বোলিংয়ের পর ব্যাট হাতেও জ্বলে ওঠেন গিলমোর। আট নম্বরে নেমে ২৮ বলে ৫টি চারেরর সাহায্যে অপরাজিত ২৮ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান এ অজি পেসার।
লর্ডসের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি হয় পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ফাইনালে টস জিতে ক্যারিবীয়দের ব্যাটিংয়ে পাঠান অজি অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল। ৫০ রানেই ৩ উইকেট তুলে নিয়ে অজি বোলাররা অধিনায়কের সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করবেন বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু এরপরই দৃশ্যপটে হাজির ক্লাইভ লয়েড। ২৬ রানে জীবন পেয়ে ৮২ বলে সেঞ্চুরি করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক।
শেষ পর্যন্ত লয়েডের ১২ চার ও দুই ছক্কায় ৮৫ বলে ১০২ এবং রোহান কানহাইয়ের ৫৫ রানের সুবাদে নির্ধারিত ৬০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৯১ রানের সংগ্রহ গড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১২ ওভার বল করে দুই মেডেনের বিনিময়ে ৪৮ রানের খরচায় ৫ উইকেটে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের মধ্যে সফলতম ছিলেন গিলমোর।
২৯২ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়াও ভালোই জবাব দিচ্ছিল। তবে এক অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল (৬২) বাদ দিলে কেউ থিতু হয়ে ইনিংস বাড়াতে না পারায় চাপে পড়ে যায় অজিরা। বিশেষ করে ভিভ রিচার্ডসের তিনটি রানআউটে অ্যালান টার্নার আর চ্যাপেল ভাইদের হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় অস্ট্রেলিয়ানরা।
সেমিফাইনালের মতো ফাইনালেও শেষদিকে ব্যাট হাতে দলকে উদ্ধার করতে নেমেছিলেন গিলমোর। তবে অস্ট্রেলিয়া ২৭৪ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ায় ১১ বলে দুই চারে তার ১৪ রানের লড়াকু ইনিংসটি বিফলে যায়। ১৭ রানের জয় নিয়ে প্রথমবারের মতো আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
শুধু সেমিফাইনাল আর ফাইনাল খেলেই ১১টি উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হন গিলমোর। ব্যাট হাতে তার ৫.৬৪ গড় আর ১৩.০৯ স্ট্রাইকরেটও ছিল সেই যুগে ঈর্ষণীয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া শিরোপা না জেতায় গিলমোরের সেই সব পরিসংখ্যান মূল্যহীন হয়ে যায়।



