Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ওয়ানডে বিশ্বকাপে বোলারদের দুঃস্বপ্ন ছিলেন যে ব্যাটাররা

বোলারদের তুলোধোনা করা ব্যাটারদের তালিকা ছোট না। তবে তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনই বোলারদের কাছে ছিলেন রীতিমতো দুঃস্বপ্ন

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:৩৫ পিএম

ক্রিকেট ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের সমন্বয় হলেও দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন ব্যাটাররাই। আগুন ঝরানো বোলিং কিংবা ফিল্ডারদের নৈপুণ্যের চেয়ে চার-ছক্কা দেখতেই দর্শকের আগ্রহ থাকে বেশি।

সময়ের প্রয়োজনে আজকাল ব্যাটাররা হয়ে উঠেছেন আরও ভয়ংকর। ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিজের দিনে বোলারদের তুলোধোনা করা ব্যাটারদের সংখ্যা একেবারে কম না। তবে বোলারদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছেন অল্প কয়েকজন ব্যাটারই।

চলুন জেনে নিই এখন পর্যন্ত আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক পাঁচ ব্যাটারের কীর্তিগাঁথা-

শচীন টেন্ডুলকার (ভারত)

ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটারের প্রসঙ্গ এলে নিঃসন্দেহে সবাই শচীন টেন্ডুলকারের নামটাই আগে নেবেন। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হোক কিংবা ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ব্যাট হাতে ছোটোখাটো গড়নের এই ভারতীয় ছিলেন আপন আলোয় উজ্জ্বল। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সর্বদাই হেসেছে লিটল মাস্টারের ব্যাট।

টেন্ডুলকার প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেন ১৯৯২ সালে। রাউন্ড রবিন ফরম্যাটের সেই বিশ্বকাপে এই ভারতীয় ৮ ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমেছিলেন। শুরুর দিকে অনুজ্জ্বল থাকলেও পরে ঠিকই তার ব্যাট থেকে রান এসেছিল। এর মধ্যে পাকিস্তান (অপরাজিত ৫৪), জিম্বাবুয়ে (৮১) ও নিউজিল্যান্ডের (৮৪) বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরিও করেন তিনি। সব মিলিয়ে অট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপে ৪৭.১৬ গড়ে ২৮৩ রান করেন শচীন। তখন শচীনের বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। কিন্তু মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের পর সেই আসরে তিনিই ছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

শচীন-টেন্ডুলকার-১৯৯৬-বিশ্বকাপ-Sachin-1996-World-Cup

বিশ্বকাপের মঞ্চে ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রথমবারের মতো শচীনের রুদ্রমূর্তি দেখেন ১৯৯৬ সালে। উপমহাদেশের মাটিতে বিশ্বকাপের সেই আসরে গ্রুপপর্বে কেনিয়ার (অপরাজিত ১২৭) বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম শতকের দেখা পান এই ভারতীয় গ্রেট। গ্রুপপর্বে শচীন পরবর্তীতে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন অন্যতম আয়োজক শ্রীলঙ্কার (১৩৭) বিরুদ্ধেও। এছাড়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৭০) আর অস্ট্রেলিয়ার (৯০) বিপক্ষে শচীন অর্ধশত করেন। শেষ আটে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে কিছু না করতে না পারলেও সেমিফাইনালে সেবারের চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তিনি ৬৫ রান করেন। সব মিলিয়ে ৮৭.১৬ গড়ে ৫২৩ রান করে সেই আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন লিটল মাস্টার।

ক্রিকেটের আদিভূমি যুক্তরাজ্যে আয়োজিত ১৯৯৯ বিশ্বকাপে শচীন অবশ্য আগের আসরের ফর্মটা টেনে নিয়ে যেতে পারেননি। গ্রুপপর্বে কেনিয়ার বিপক্ষে ১০১ বলে অপরাজিত ১৪০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ছাড়া ব্যাট হাতে এই ডানহাতি ব্যাটার তেমন কিছুই করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৭ ম্যাচ খেলে সেই আসরে ৪২.১৬ ব্যাটিং গড়ে ২৫৩ রান করেছিলেন এই ভারতীয়।

শচীন-টেন্ডুলকার-Sachin-Tendulkar-2003-WC

২০০৩ সালে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপে শচীন রীতিমতো নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। শচীন ব্যাট হাতে নামবেন আর প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে তুলোধোনা করবেন- সেই আসরে এটাই ছিল নিয়মিত দৃশ্য। পুল স্টেজে নেদারল্যান্ডস (৫২), জিম্বাবুয়ে (৮১), ইংল্যান্ড (৫০), পাকিস্তান (৯৮); সুপার সিক্সে শ্রীলঙ্কা (৯৭) আর সেমিফাইনালে কেনিয়ার (৮৩) বিপক্ষে অর্ধশতক করেন। পুল স্টেজে নামিবিয়ার বিপক্ষে শচীন ১৫২ রানের ইনিংস খেলেন, যা ওই আসরের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে ১১ ম্যাচে ৬১.১৮ গড়ে ৬৭৩ রান করে সেই আসর তো বটেই, শচীন বিশ্বকাপের এক আসরের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েন যা আজও টিকে আছে। পাশাপাশি লিটল মাস্টারের হাতে উঠেছিল টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও।

২০০৭ সালে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে শচীন যেন ছিলেন নিজের ছায়া। ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাত্র ৭ রান করেছিলেন শচীন। বারমুডার বিপক্ষে পরের ম্যাচে ৫৭ রানে অপরাজিত থাকলেও সেবারের রানার্সআপ শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে রানের খাতা খোলার আগেই আউট হন তিনি। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে ওপেনিং থেকে মিডল অর্ডারে আসা শচীন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে আয়োজিত সেই আসরে তিন ম্যাচে ৩২ গড়ে মাত্র ৬৪ রান করেছিলেন।

শচীন-টেন্ডুলকার-মুশফিকুর-রহিম

১৫ বছর পর ২০১১ সালে আরো একবার উপমহাদেশে আয়োজিত হয় ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ১৯৯৬ সালের মতো এই আসরেও শচীনের ব্যাট হেসেছিল। গ্রুপপর্বে ইংল্যান্ড (১১৫ বলে ১২০) আর দক্ষিণ আফ্রিকার (১০১ বলে ১১১) বিপক্ষে তিনি করেছিলেন সেঞ্চুরি। সেই সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া (৫৩) ও সেমিফাইনালে পাকিস্তানের (৮৫) বিপক্ষে শচীনের ব্যাট থেকে এসেছিল হাফ সেঞ্চুরিও। সব মিলিয়ে নিজের শেষ বিশ্বকাপে ৯টি ম্যাচে ৫৩.৫৫ গড়ে ৪৮২ রান করে সেই আসরে ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন শচীনই। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখিয়ে শ্রীলঙ্কার তিলকারত্নে দিলশানের পর টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনিই ছিলেন।

শচীন-টেন্ডুলকার-২০১১-বিশ্বকাপ-Sachin-Tendulkar-2011-WC

বড়ে মিয়া খ্যাত পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াঁদাদের পাশাপাশি একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ৬টি ভিন্ন আসরে খেলার কৃতিত্ব আছে শুধু শচীনেরই। এই ছয় আসরে খেলা ৪৫ ম্যাচের মধ্যে ৪৪ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে ৬টি সেঞ্চুরি এবং ১৫টি হাফ সেঞ্চুরির মাধ্যমে ৫৬.৯৫ গড়ে ২,২৭৮ রান করেছেন এ জীবন্ত কিংবদন্তি। ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে সর্বোচ্চ রানের মালিক তো বটেই, একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ২,০০০+ রান করার কৃতিত্ব আছে শুধু শচীনেরই। এছাড়া, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি শতক এবং অর্ধশতক হাঁকানো ব্যাটারও তিনিই। বিশ্বকাপের সর্বশেষ ৯ আসরে ভারত ফাইনালে যেতে পেরেছে মাত্র দুইবার। সেই দুবারেই দলের পক্ষে সেরা পারফর্মার ছিলেন এ লিটল মাস্টার। পড়ন্ত বেলায় দেশকে শিরোপা এনে দিয়ে মিটিয়েছেন বিশ্বকাপ জেতার অতৃপ্তিও।

রিকি পন্টিং (অস্ট্রেলিয়া)

আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও রিকি পন্টিং যে টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক, তাতে দ্বিমত করার লোক খুব বেশি থাকবে বলে মনে হয় না। একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে মোট ২৯টি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করে মাত্র দুটি পরাজয়ের বিপরীতে ২৬টিতেই জয় এনে দিয়ে জিতিয়েছেন দুটি শিরোপা। তবে ব্যাট হাতেও বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের বোলারদের খুবলে খেতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন পন্টিং।

১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক হয় রিকি পন্টিংয়ের। উপমহাদেশে আয়োজিত সেই আসরে তিনি ব্যাট হাতে নেমেছিলেন ৭টি ম্যাচে, যদিও গ্রুপপর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১০২ রানের ইনিংসটি বাদে কোনো ম্যাচেই আর অর্ধশতকও হাঁকাতে পারেননি এই ডানহাতি ব্যাটার। তবুও ৩২.৭১ গড়ে ২২৯ রান করে সেই আসরে নিজ দলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন এ অস্ট্রেলিয়ান।

রিকি-পন্টিং-Ricky-Ponting-2003-WC-Reuters

১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়া শিরোপা জিতলেও ব্যাট হাতে পন্টিং ছিলেন আগের আসরের তুলনায় গড়পড়তা। আগের আসরে একটি ম্যাচে সেঞ্চুরি থাকলেও এবার সুপার সিক্সে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৬৯ রানই ছিল তার পক্ষে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। যদিও সেই আসরে কোনো ম্যাচেই তার রান দুই অঙ্কের নিচে ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১০ ম্যাচে ৩৯.৩৩ গড়ে ৩৫৪ রান করে ওয়াহ ভ্রাতৃদ্বয়ের পর সেই আসরে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সফল ব্যাটার ছিলেন পন্টিং।

২০০৩ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বভার ওঠে পন্টিংয়ের কাঁধে। অধিনায়কত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন ব্যাট হাতেও জ্বলে ওঠেন। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ১২১ বলে চারটি চার ও আট ছক্কায় অপরাজিত ১৪০ রানের ইনিংস খেলে ম্যান অব দ্য ফাইনাল হন এ অস্ট্রেলিয়ান। এছাড়া পুলপর্বে পাকিস্তানের (৫৩) বিরুদ্ধে আর সুপার সিক্সে শ্রীলঙ্কার (১১৪) বিপক্ষে সেঞ্চুরিও আসে তার ব্যাট থেকে। সেই আসরে ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে ব্যাটিং করে ৫১.৮৭ গড়ে ৪১৫ রান করে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ আর টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন পন্টিং।

রিকি-পন্টিং-Ricky-Ponting-2003-WC

২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে আয়োজিত বিশ্বকাপেও পন্টিং আগের আসরের চেয়েও ক্ষুরধার ছিলেন। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৩ বলে ৯টি বাউন্ডারি আর পাঁচ ছক্কায় ১১৩ রান করেন এ অস্ট্রেলিয়ান। পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯১, সুপার সিক্সে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৬, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ৮৬ এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৬ রানের ইনিংসও এসেছিল পন্টিংয়ের কাছ থেকে। সেমিফাইনাল আর ফাইনালে খুব বড় কিছু না করলেও ৬৭.৩৭ গড়ে ৫৩৯ রান করে ম্যাথু হেইডেনের পর ওই আসরে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন।

যে উপমহাদেশের মাটিতে পন্টিংয়ের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল, ২০১১ সালে সেখানেই ক্যারিয়ারে শেষবারের মতো বিশ্বকাপ খেলেন তিনি। পড়ন্ত বেলায় সেবার অন্যতম আয়োজক ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ১০৪ রানের ইনিংসটি ছাড়া পুরো আসরেই পন্টিং নিজের ছায়া ছিলেন। সেই আসরেই অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দুটি পরাজয়ের তেতো স্বাদ পান এ অস্ট্রেলিয়ান। নিজের সর্বশেষ বিশ্বকাপে ছয় ইনিংস ব্যাট করে ৩৪.৩৩ গড়ে পন্টিং ২০৬ রান করেছিলেন।

রিকি-পন্টিং-Ricky-Ponting-2007-WC

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের পাঁচ আসরে মাঠে নেমেছেন পন্টিং। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৬ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তার দখলে। এর মধ্যে দলের হয়ে সর্বোচ্চ তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন পন্টিং। আর ৪২ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে ৪৫.৮৬ গড়ে ১,৭৪৩ রান করেছেন পান্টার খ্যাত এই ডানহাতি ব্যাটার, যার মধ্যে ছিল পাঁচটি সেঞ্চুরি এবং ৬টি হাফ সেঞ্চুরি।

কুমার সাঙ্গাকারা (শ্রীলঙ্কা)

উইকেটরক্ষকদের মূল দায়িত্বটা থাকে উইকেটের পেছনে দাঁড়ানোই। তবে সেই দায়িত্ব সামলে কেউ কেউ দলের ব্যাটিং স্তম্ভের শক্ত ভিত্তি হিসেবে হয়ে ওঠেন বড় তারকা। কুমার সাঙ্গাকারা ছিলেন তেমনই এক ক্রিকেটার। গ্লাভস হাতে যেমন প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন, তেমনি ব্যাট হাতে দৃষ্টিনন্দন শটের পসরা সাজিয়ে এই লঙ্কান ক্রিকেটার কচুকাটা করতেন বোলারদের।

নব্বই দশকের শেষদিকে শ্রীলঙ্কা দলে অভিষেক হওয়ার পর সাঙ্গাকারা ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেন। তবে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে বলার মতো কিছুই করতে পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় আয়োজিত সেই আসরে দশ ম্যাচে ২৫.১৪ ব্যাটিং গড়ে মাত্র ১৭৬ রান করেছিলেন এই লঙ্কান উইকেটরক্ষক। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত ৩৯ রানই ছিল সেই টুর্নামেন্টে সাঙ্গাকারার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। অভিষেক বিশ্বকাপটা তাই তার জন্য মনে রাখার মতো তেমন কিছুই ছিল না।

কুমার-সাঙ্গাকারা-Kumar-Sangakkara-AFP

২০০৭ বিশ্বকাপে যেন আগের আসরের দুঃস্বপ্ন মাটিচাপা দেওয়ার মিশন হাতে নিয়েছিলেন সাঙ্গাকারা। গ্রুপপর্বে বারমুডা (৭৬) ও বাংলাদেশের (৫৬) বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচেই অর্ধশতক তুলে নেন সাঙ্গা। সুপার এইট নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৯ রানের ইনিংসটি ছাড়া এই পর্বে অধিকাংশ সময়েই তিনি নিষ্প্রভ ছিলেন। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় সাঙ্গাকারা ৫২ বলে ৫৪ রান করলেও দল হেরে যাওয়ায় সেটি আদতে বিফলে গেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজে আয়োজিত ওই আসরে ১১ ম্যাচে চারটি অর্ধশতকের মাধ্যমে তিনি ৩৫ গড়ে ৩৫০ রান করেছিলেন।

২০১১ বিশ্বকাপেও সাঙ্গাকারার ব্যাটে রানের ফুলঝুরি ছুটেছিল। গ্রুপপর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১১ ও কানাডার বিপক্ষে ৯২ রানের ইনিংস খেলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। সেমিফাইনালেও ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে তার কাছ থেকে আসে ৫৪ রানের আরেকটি স্থিতধী ইনিংস। এছাড়া পুরো আসরে বাকি ম্যাচগুলোয়ও মাঝারি কিন্তু কার্যকর বেশ কয়েকটি ইনিংস খেলেছিলেন এই উইকেটরক্ষক। উপমহাদেশের মাটিতে অনুষ্ঠেয় সেই আসরে ৯ ম্যাচের মধ্যে আট ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে একটি শতক এবং তিনটি অর্ধশতকের সুবাদে ৯৩ গড়ে ৪৬৫ রান করেছিলেন সাঙ্গা।

কুমার-সাঙ্গাকারা-Kumar-Sangakkara-2015-WC

২০১৫ সালে যখন সাঙ্গাকারা যখন শেষবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে যান, তখন তার বয়স ৩৮ ছুঁইছুঁই। ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় এই লঙ্কান ব্যাটার যেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামেন। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ওই আসরের প্রথম দুই ম্যাচে বলার মতো কিছু না করতে পারলেও গ্রুপপর্বে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭৬ বলে ১৩ চার ও এক ছক্কায় অপরাজিত ১০৫ রানের ইনিংস খেলে স্বরূপে ফেরেন তিনি। এরপর টানা তিন ম্যাচে একে একে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১ বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় ৮৬ বলে ১১৭, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১ চারে ১০৭ বলে ১০৪ ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫ বলে ১৩ বাউন্ডারি ও চার ছক্কায় ১২৪ রানের ইনিংস খেলেন সাঙ্গাকারা। কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে বিদায় নেওয়া ম্যাচেও তিনি দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪৫ রান করেন। শ্রীলঙ্কা শেষ আট থেকে বিদায় নিলেও সাত ম্যাচে চারটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ১০৮.২০ গড়ে ৫৪১ রান করে মাত্র ৬ রানের ব্যবধানে তাসমান সাগরের পাড়ে অনুষ্ঠিত সেই আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন সাঙ্গাকারা।

কুমার-সাঙ্গাকারা-Kumar-Sangakkara

ক্যারিয়ারে ২০০৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চারবার আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিত্ব করেন কুমার সাঙ্গাকারা। এই চার আসরে ৩৭ ম্যাচের মধ্যে ৩৫ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে ৫৬.৭৪ গড়ে ও ৮৬.৫৫ স্ট্রাইক রেটে ১,৫৩২ রান করেছেন এই শ্রীলঙ্কান উইকেটরক্ষক-ব্যাটার, যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি সেঞ্চুরির এবং সাতটি ফিফটি। বিশ্বকাপের মঞ্চেই সাঙ্গাকারা ওয়ানডেতে প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্যাটার হিসেবে টানা চার ইনিংসে শতক হাঁকানোর অনন্য কীর্তি গড়েন।

ব্রায়ান লারা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের স্বর্ণালি সময় ছিল আশির দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত। প্রথম দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন ও তৃতীয় আসরে রানার্সআপ হলেও নববইয়ের দশকের পর থেকে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে ক্যারিবীয়দের সাফল্য নেই বললেই চলে। মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ শেষ হওয়ার পরই ব্রায়ান লারার আবির্ভাব হয়। ক্যারিবীয় ক্রিকেটের বরপুত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কিছু এনে দিতে পারেননি সত্যি। তবে এটাও সত্যি যে লারার সময়ে ক্যারিবীয় ক্রিকেটে তার মতো ব্যাট হাতে সফল কেউ ছিলেন না।

আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে লারার অভিষেক হয় ১৯৯২ সালে। রাউন্ড রবিন ফরম্যাটে আয়োজিত সেই আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেমিফাইনালে যেতে পারেনি। তবে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই ব্যাট হাতে লারা ছিলেন উজ্জ্বল। পাকিস্তানের বিপক্ষে আহত হয়ে উঠে যাওয়ার আগে ১০১ বলে ১১ বাউন্ডারিতে ৮৮ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচসেরা হন তিনি। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচেই ০ রানে আউট হন লারা। তবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের ম্যাচেই ১২ চারে ৭১ বলে ৭২ রান করে আবার স্বরূপে ফেরেন এই বাঁহাতি। পরবর্তীতে সেই আসরের দুই আয়োজক নিউজিল্যান্ড (৫২) আর অস্ট্রেলিয়ার (৭০) বিপক্ষেও অর্ধশতক হাঁকান লারা। সব মিলিয়ে সেই আসরে আট ম্যাচ খেলে চারটি অর্ধশতক হাঁকিয়ে ৪৭.৫৭ গড়ে তিনি ৩৩৩ রান করেছিলেন।

ব্রায়ান-লারা-১৯৯৬-বিশ্বকাপ-Lara-1996-WC

১৯৯৬ বিশ্বকাপে আগের আসরের ফর্মটা পুরোপুরি টেনে নিয়ে আসতে পারেনি লারা। আগে দলের হয়ে ইনিংস উদ্বোধন করলেও উপমহাদেশে আয়োজিত সেই আসরে লারা ব্যাট হাতে নামতেন তিন নম্বরে। এক অস্ট্রেলিয়ার (৬০) বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে গ্রপপর্বে তিনি ছিলেন নিজের ছায়া। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছিলেন লারাই। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ৯৪ বলে ১১১ রানে দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন এ বাঁহাতি। ১৬টি বাউন্ডারিতে সাজানো ওই ইনিংসের মাধ্যমেই একাই গ্রুপপর্বে অপরাজিত থাকা দক্ষিণ আফ্রিকানদের বিদায় করে দেন লারা। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে লারা ঝড়োগতিতে ৪৫ রান করলেও ক্যারিবিয়ানদের বিদায় ঠেকাতে পারেননি। সব মিলিয়ে সেই ছয় ম্যাচ খেলে একটি করে শতক এবং অর্ধশতকের সুবাদে ৫৩.৮০ গড়ে ২৬৯ রান করেছিলেন লারা।

ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়কত্বের ভার ছিল লারার কাঁধে। কিন্তু নতুন ভূমিকায় লারা যেমন ব্যাট হাতে সফল হতে পারেননি, তেমনি ওয়েস্ট ইন্ডিজও হয়েছিল ব্যর্থ। নিউজিল্যান্ডের সমান পয়েন্ট নিয়ে নেট রানরেটের হিসাবে ভগ্নাংশের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে গ্রুপপর্ব পেরোতে পারেনি ক্যারিবীয়রা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচ ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমে মাত্র ১০৬ রান করেছিলেন লারা।

ব্রায়ান-লারা-১৯৯৬-বিশ্বকাপ-BC-Lara-1996

২০০৩ সালে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে লারার শুরুটা হয়েছিল দুর্দান্ত। আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠেয় সেই আসরের উদ্বোধনী ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি (১১৬) করে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন এই ক্যারিবীয় রাজপুত্র। তবে কানাডার বিপক্ষে ৪০ বলে আট চার ও পাঁচ ছক্কায় সাজানো ৭৩ রানের ইনিংস বাদ দিলে পুল পর্বের বাকি অংশে লারার ব্যাট তেমন আসেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজও তাই ব্যর্থ হয় সুপার সিক্সে পা রাখতে। ওই আসরে একটি করে সেঞ্চুরি এবং হাফ সেঞ্চুরির মাধ্যমে ৪১.৩৩ গড়ে ২৪৮ রান করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।

ওয়ানডে বিশ্বকাপের মঞ্চে লারাকে শেষবারের মতো ব্যাট হাতে দেখা যায় ২০০৭ সালে। ঘরের মাঠে আয়োজিত সেই বিশ্বকাপে লারার ব্যাটে বড় কিছুর স্বপ্ন দেখছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু ওই আসরে ব্যাট হাতে লারা ব্যর্থই ছিলেন বলতে হবে। সুপার এইটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭৭ রানের ইনিংস ব্যতিত কোনো ম্যাচেই বড় স্কোর করতে পারেননি এই বাঁহাতি ব্যাটার। নিজের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে ৯টি ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমে ৩৮.৪২ গড়ে ২৬৯ রান করতে সমর্থ হয়েছিলেন লারা।

ব্রায়ান-লারা-২০০৭-বিশ্বকাপ-BC-Lara-2007-WC

আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের পাঁচ আসরে খেললেও দলগতভাবে লারার অর্জনের পাল্লা খালিই। তবে ব্যাটিংয়ে লারা নিজের ভূমিকায় সফল ছিলেন বলেই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন। বিশ্বকাপে সর্বমোট ৩৪ ম্যাচ খেলে দুটি সেঞ্চুরি এবং ৭টি অর্ধশতকের সাহয্যে ৪২.২৪ গড়ে ১,২২৫ রান করেছেন এই ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। তবে শেষ দুই বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্যের প্রতি সুবিচার করে ব্যাট হাতে আরেকটু উজ্জ্বল ও ধারাবাহিক হলে হয়তো লারার অবস্থান আরও উঁচুতেই থাকতো।  

এবি ডি ভিলিয়ার্স (দক্ষিণ আফ্রিকা)

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটারের সংখ্যা নিতান্ত কম না। যেকোনো জায়গায় যেকোনো পরিস্থিতিতে আগ্রাসী ব্যাটিংই তাদের কাছে শেষ কথা। তবে তাদের মধ্যে খুব কম খেলোয়াড়ই ব্যাট হাতে বৈচিত্র্যময়। দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স সেই বিরলতম ক্রিকেটারদের মধ্যে একজন। ২২ গজে ব্যাট হাতে তার মতো বাহারি শট খেলতে পারা ক্রিকেটারদের তালিকাও খুব ছোটই। পুরো মাঠের চারপাশে স্ট্রোক খেলার বিশেষ ক্ষমতার সুবাদে এই প্রোটিয়া ব্যাটার মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি হিসেবে পরিচিত। বিশেষত রিভার্স সুইপ অথবা হাঁটু গেড়ে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শী তিনি। ওয়ানডে বিশ্বকাপও অনেকবারই ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং শৈলীর সাক্ষী হয়েছে। তবুও দক্ষিণ আফ্রিকা দলের মতোই একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে দুর্ভাগা ছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার।

এবি-ডি-ভিলিয়ার্স-AB-DE-VILLIERS-2007-afp

ডি ভিলিয়ার্স প্রথমবারের মতো আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেন ২০০৭ সালে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠেয় সেই বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে তিনি ধারাবাহিক ছিলেন না। তবে বিশ্বকাপ অভিষেকটা এই প্রোটিয়া ব্যাটারের জন্য বিস্মরণযোগ্যই ছিল বটে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচেই শূন্য রানে আউট হন ডি ভিলিয়ার্স। তবে গ্রুপপর্বে পরের দুই ম্যাচেই স্কটল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যথাক্রমে ৪৫ বলে ৬২ ও ৭০ বলে ৯২ রানের দুটি ঝড়ো ইনিংস খেলেন।

সুপার এইট পর্বে অবশ্য শুরুটা হলো ভয়াবহ; প্রথম দুই ম্যাচেই শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন ডি ভিলিয়ার্স। স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ১৩০ বলে ১২ বাউন্ডারি ও পাঁচ ছক্কায় ১৪৬ রানের ইনিংস খেলে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম শতক তুলে নেন এই ডানহাতি ব্যাটার। তবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচেই সেই আসরে চতুর্থবারের মতো তিনি ডাক মারেন। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে আয়োজিত সেই আসরে দক্ষিণ আফ্রিকা সেমিফাইনালে পৌঁছালেও ডি ভিলিয়ার্সের ব্যাট আর হাসেনি। উইকেটরক্ষক আর ওপেনারের ভূমিকায় নিজের বিশ্বকাপ অভিষেকে একটি সেঞ্চুরি এবং দুটি হাফ সেঞ্চুরির মাধ্যমে ৩৭.২০ গড়ে ৩৭২ রান করেন ডি ভিলিয়ার্স।

এবি-ডি-ভিলিয়ার্স-AB-DE-VILLIERS-2007

উইকেটরক্ষক হিসেবে রয়ে গেলেও উপমহাদেশের মাটিতে অনুষ্ঠেয় ২০১১ বিশ্বকাপে ডি ভিলিয়ার্স আর ওপেনারের ভূমিকায় ছিলেন না। ইনিংস উদ্বোধনের জায়গায় এই প্রোটিয়া ব্যাটারের দায়িত্ব ছিল মিডল অর্ডারের ভার সামলানো। ডি ভিলিয়ার্স সেটি পেরেছিলেনও বৈকি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি (১০৭) হাঁকান এই ডানহাতি ব্যাটার। পরের ম্যাচেই নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও সেঞ্চুরি করেছিলেন ডি ভিলিয়ার্স, ৯৮ বলে ১৩ বাউন্ডারি ও চার ছক্কায় খেলেছিলেন ১৩৪ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস। গ্রুপপর্বে সেই আসরের অন্যতম আয়োজক ভারতের বিপক্ষেও ৩৯ বলে ৫২ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি।

দাপুটেভাবে গ্রুপপর্ব পেরিয়ে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড। অল্প রানের লক্ষ্যে সহজ জয়ের দিকেই এগোচ্ছিল প্রোটিয়ারা। কিন্তু সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও ব্যাটিং লাইনআপ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ায় বিদায় নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ডি ভিলিয়ার্স ব্যক্তিগত ৩৫ রানে আউট হওয়ার পরই দলের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। ২০১১ বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমে দুটি শতক এবং একটি অর্ধশতকের মাধ্যমে ৮৮.২৫ গড়ে ৩৫৩ রান করেছিলেন ডি ভিলিয়ার্স। সেমিফাইনালে না খেলেও এই দক্ষিণ আফ্রিকান ঠিকই সেই আসরের সর্বোচ্চ দশ রানসংগ্রাহকের তালিকায় ছিলেন।

এবি-ডি-ভিলিয়ার্স-AB-DE-Villiers-AFP

ওপেনারের ভূমিকা তো ছেড়েছিলেন আগের আসরেই, ২০১৫ বিশ্বকাপে ডি ভিলিয়ার্স ছেড়ে দিয়েছিলেন উইকেটরক্ষকের দায়িত্বও। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বভার ছিল এই ডানহাতি ব্যাটারের ওপরই। নতুন ভূমিকায় বাড়তি দায়িত্ব পেয়ে প্রথম দুই ম্যাচে জিম্বাবুয়ে আর ভারতের বিপক্ষে নিষ্প্রভ ছিলেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। কিন্তু পরের ম্যাচেই বিশ্বকাপে নিজের প্রিয় প্রতিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জ্বলে ওঠেন ডি ভিলিয়ার্স, মাত্র ৬৬ বলে ১৭ চার ও আট ছক্কায় ১৬২ রানের অতিমানবীয় ইনিংস খেলেন। গ্রুপপর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫৮ বলে ৭ বাউন্ডারি ও পাঁচ ছয়ে ৭৭ রানের দারুণ এক ইনিংস খেললেও বাকিদের ব্যর্থতায় দলের হারে তা বিফলে যায়। এক রানের জন্য সেই আসরে অভিষিক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি ডি ভিলিয়ার্সের। তবে ৮২ বলে ছয় চার ও চার ছয়ে ৯৯ রানের ইনিংসটিও ছিলে অনিন্দ্যসুন্দর। কোয়ার্টার ফাইনালে আগের আসরের রানার্সআপ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অবশ্য তাকে ব্যাটিংয়ে নামতে হয়নি। তবে বৃষ্টিবিঘ্নিত সেমিফাইনালে ঠিকই ৪৫ বলে আট বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ৬৫ রানে অপরাজিত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বড় সংগ্রহ এনেদ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফিল্ডিংয়ে সহজ রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া করায় শেষ পর্যন্ত হতাশাজনকভাবে পরাজিত হয় প্রোটিয়ারা। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্দে অনুষ্ঠেয় ওই আসরে আট ম্যাচের সাত ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে একটি সেঞ্চুরি এবং তিনটি ফিফটি হাঁকিয়ে ৯৬.৪০ গড়ে এবং ১৪৪.৩১ স্ট্রাইক রেটে তিনি ৪৮২ রান করেছিলেন।

এবি-ডি-ভিলিয়ার্স-২০১৫-বিশ্বকাপ-De-Villers-ICC

যুক্তরাজ্যে আয়োজিত ২০১৯ বিশ্বকাপেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ডি ভিলিয়ার্সের। কিন্তু আগের বছরই একরকম আচমকাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন এই ডানহাতি ব্যাটার। আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে মাত্র তিন আসরে খেলেছেন এই প্রোটিয়া ব্যাটার। কিন্তু তাতেই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পাঁচ রান সংগ্রাহকের মধ্যে একজন হয়েছেন ডি ভিলিয়ার্স। একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বযজ্ঞে খেলা ২৩টি ম্যাচের মধ্যে ২২ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমে চারটি সেঞ্চুরি ও ছয়টি হাফ সেঞ্চুরির সুবাদে ৬৩.৫৬ গড়ে এবং ১১৭.২৯ স্ট্রাইক রেটে ১,২০৭ রান করেছেন মিস্টার ৩৬০ খ্যাত এই ক্রিকেটার। ওয়ানডে বিশ্বকাপে ডি ভিলিয়ার্স বিশ্বকাপে কমপক্ষে ২০ ইনিংস ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার ব্যাটিং গড় সর্বোচ্চ। এছাড়া, ওয়ানডে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষ ৩৭ জন ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটও ডি ভিলিয়ার্সেরই।

   

About

Popular Links

x