Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইউরোপেও জায়গা করে নিতে চান ঋতুপর্ণা

সদ্য সমাপ্ত সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা খেলোয়াড়ে হয়েছেন বাংলাদেশের ঋতুপর্ণা চাকমা

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৩৬ পিএম

প্রথম ম্যাচ থেকেই মাঠে আলো ছড়ানো শুরু করেন। প্রত্যেক ম্যাচেই দেখা গেছে তার ঝিলিক। সঙ্গে পুঁজি করেছেন সেমিফাইনাল ও ফাইনালে একটি করে গোল। তাই সদ্য সমাপ্ত সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার যখন হাতে নিলেন অবাক হওয়ার কিছু ছিল না।

বাম প্রান্ত থেকে একের পর এক আক্রমণ করে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বেশ নাকানিচুবানি খাইয়েছেন। যেমন সুযোগ তৈরি করেছেন, তেমনি গোল করিয়েছেন, আবার গোলও করেছেন প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ম্যাচে। সেই সুবাদে পেয়েছেন ইউরোপে খেলার ডাক।

সাফ জিতে দেশে ফেরার পর নানা ব্যস্ততার মধ্যেও ঢাকা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হন ঋতুপর্ণা চাকমা। সেখানে মূলত উঠে এসেছে দারিদ্র্যকে জয় করে ঋতুপর্ণার ফুটবল হয়ে ওঠার গল্প ও ভবিষ্যত লক্ষ্য।

শিশির হক’র নেওয়া সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো।

ফুটবলে শুরু কীভাবে?

ফুটবল খেলা শুরু করেছি ২০১২ সালে। তখন ক্লাস থ্রিতে পড়াশোনা করি। ২০১১ সাল থেকে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা গোল্ড কাপ প্রাথমিক স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। আমাদের বিদ্যালয় ঐ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। সেই বছর আমাদের বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়। এই প্রতিযোগিতার কারণে আমার ফুটবলার হয়ে ওঠা। ২০১২ সালে যখন আমি ফুটবলে প্রথম লাথি মারি আমার পায়ের নখ উঠে যায়। আমি জানতাম না যে মেয়েরা ফুটবল খেলে। তখন আমি অনেক ছোট। শখের বশে খেলতাম। ভালো লাগত। নখ উঠে যাওয়ার পর ট্রেনিংয়ে যেতাম না। আমার শিক্ষক বীর সেন চাকমা; যিনি সম্পর্কে আমার জেঠা হন ওনাকে আমি ভয় পেতাম। ওনার কারণে আবার ট্রেনিংয়ে যাই। আমি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছি। আমরা যেখানে ট্রেনিং করতাম সেখানে আমার বাসা থেকে আসতে ভাড়া ২০ টাকা ছিল। অনেক দূরে ছিল। প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার দুরত্ব। আমার বাবা একজন দিনমজুর কৃষক ছিলেন। দিন আনে দিন খেতাম। আমরা ৪ বোন ১ ভাই ছিলাম। ভাই ২০২১ সালে মারা যায়। বাবা মারা যান ২০১৫ সালে। আমি তখন অনেক ছোট। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের অবস্থা একদমই অচল হয়ে পড়ে। ট্রেনিংয়ে আমার যাওয়া আসার ভাড়া যোগান দেয়া মায়ের পক্ষে অসম্ভব ছিল। কারণ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন বাবা। বাবা মারা যাওয়ার পর তিন বোনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আমি আর আমার ভাই পড়াশোনা চালিয়ে যাই। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বীর সেন চাকমা আমার পড়াশোনা ও খেলাধুলা করার সুযোগ করে দেন। ২০১৫ সালে আমি বিকেএসপিতে ট্রায়াল দেই এবং নির্বাচিত হই। বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার টাকা ছিল না। জেঠা (বীর সেন চাকমা) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থের ব্যবস্থা করে দেন। প্রায় ১ বছর বিকেএসপিতে ছিলাম। মাসিক বেতনও দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না মায়ের। সেজো দিদি চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে চাকরি করত। দিদি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। খেলাধুলা ও পড়াশোনা করার কারণে গ্রামের অনেকে কটুকথা বলেছিল। দিদি পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু যেটুকু বেতন পেত তা দিয়ে চলা সম্ভব হত না। বিকেএসপিতে আমার অনেক মাসের বেতন বকেয়া ছিল। দিদি স্বর্ণের কানের দুল বিক্রি করে আমার জন্য টাকা জোগার করত। অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছিল। সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

জাতীয় দলে শুরু কেমন ছিল?

জাতীয় দল বলতে আমি কিছু বুঝতাম না শুরুতে। ২০১৭ সালে প্রথম অনূর্ধ-১৫ দলে খেলেছিলাম। ঐখান থেকে আমার পথ চলা। ২০১৯ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয়। এর আগে অনুর্ধ্ব ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ খেলেছিলাম। এরপর মায়ানমারে অলিম্পিক বাছাইপর্বে খেলতে গিয়ে আমার সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক হয়। ২০১৯ সালে সাফ খেলা হয়নি। ২০২২ সালে প্রথম সাফ খেলি।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের অভিজ্ঞতা কেমন লেগেছে?

এটি ছিল ইতিহাস। প্রথমবার আমরা সাফ (সিনিয়র) চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। সেই দলের সদস্য হিসেবে আমি খুবই গর্বিত। কারণ, বাংলাদেশের নারী ফুটবলে এটি একটি ইতিহাস। এই ইতিহাসের অংশ হওয়া আমার একটি বড় অর্জন। মাঠে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ঐ সাফে বদলি হয়ে নামতাম। যখনই মাঠে নামি চেষ্টা করি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলার। ২০২২ সালে কমিটমেন্ট করেছিলাম পরের সাফে দলে থাকতে হবে এবং ভালো খেলতে হবে। বেশ পরিশ্রম করেছি। এবার সাফে প্রত্যেক ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলাম।

এখন আপনি লেফ্ট উইংয়ে খেলেন। স্কুলে থাকতে কোথায় খেলতেন?

স্ট্রাইকার হয়ে খেলতাম। মিডফিল্ডেও খেলতাম। বেশিরভাগ খেলেছি উইংয়ে। শুরুতে মিডফিল্ডে খেলতাম। বিকেএসপি যখন যাই তখন থেকে উইংয়ে খেলা শুরু করি।

ফুটবলে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান কার?

ফুটবলে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান শ্রদ্ধেয় বীর সেন চাকমা ও কোচ শান্তি মনি চাকমা কাকা এবং তার যারা সহযোগী ছিলেন। অনেকেই ছিলেন। তবে এই দু’জনের অবদান সবচেয়ে বেশি।

পাহাড়ে বেড়ে উঠেছেন। পাহাড়ের কি বেশি পছন্দ?

আমরা পাহাড়িরা অনেক পরিশ্রমী। অনেক পরিশ্রম করতে হয় আমাদের। জীবিকা নির্বাহের জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। পরিশ্রম ছাড়া তো জীবন চলবে না। জীবনে ভালো কিছু করতে হলে পরিশ্রম করতে হবে।

প্রিয় খেলোয়াড় কে?

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

নিজেকে ভবিষ্যতে কোথায় দেখতে চান?

আমার ক্যারিয়ার মাত্র শুরু। ফুটবল নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন আছে। বাংলাদেশকে আরও বিজয় ও ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ও ইচ্ছা আছে - শুধু দক্ষিণ এশিয়া না, এশিয়া ও ইউরোপেও জায়গা করে নেওয়া। দেশের বাইরে ইউরোপিয়ান লিগে খেলার ইচ্ছা আছে। একটা অফার এসেছে। যদি সব ঠিকঠাক হয় সুযোগটা কাজে লাগাব।

   

About

Popular Links

x