ইউটিউবের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছেন জিমি ডোনাল্ডসন, যিনি মিস্টার বিস্ট নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সম্প্রতি তিনি ইউটিউবে ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক স্পর্শ করে এই রেকর্ড গড়েছেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন, মিস্টার বিস্ট তিনি এত জনপ্রিয়? এর পেছনে আসলে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।
প্রথমত, তার ভিডিওতে অবিশ্বাস্য সব চ্যালেঞ্জ থাকে। তার ভিডিও মানেই বিশাল আয়োজন আর টান টান উত্তেজনা। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ “স্কুইড গেম”-এর পুরো সেট বানিয়ে সাধারণ মানুষকে নিয়ে সেই খেলার আয়োজন করেছেন তিনি। সেই ভিডিও এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ কোটি মানুষ দেখেছে। টানা ৫০ ঘণ্টা জীবন্ত কবরের নিচে শুয়ে ছিলেন তিনি। মিসরের পিরামিডগুলোর ভেতরে কাটিয়েছেন ১০০ ঘণ্টা।
দ্বিতীয়ত, মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। বিস্ট তার ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গাড়ি, বাড়ি, এমনকি লাখ লাখ টাকা উপহার দেন। একবার তো তিনি তার এক সাবস্ক্রাইবারকে একটি ব্যক্তিগত দ্বীপই উপহার দিয়ে দিয়েছিলেন! মাত্র কিছুদিন আগে একজনকে দিয়েছেন একটি বিমান।
তৃতীয়ত, মানুষের জন্য কাজ করেন জিমি। তিনি অনেক দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন, এখনো করছেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ১০০টি কুয়ো খনন করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছেন। এক হাজার দৃষ্টিহীন মানুষের চোখের ছানি অপারেশন করিয়ে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য লাখ লাখ ডলার দান করেছেন। ২০১৯ সালে ২০ মিলিয়ন গাছ লাগানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। ৫৬ দিনের মধ্যে সেই লক্ষ্য পূরণ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪.৮ মিলিয়নের বেশি গাছ লাগিয়েছেন তিনি। সমুদ্র থেকে ৩০ মিলিয়নের বেশি প্লাস্টিক ও বর্জ্য পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ২০২১ সালে। এছাড়া বিভিন্নভাবে স্কুলে সহায়তা, দরিদ্রদের উপকার করা তো তার জন্য নিয়মিত ব্যাপার।
তবে মিস্টার বিস্টের শুরুটা এত মসৃণ ছিল না। ১০ বছর আগের কথা। ইউটিউব তখন এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু জিমি হয়তো এর ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন। তিনি কনটেন্ট বানাতেন। কনটেন্ট বানানো তার কাছে নেশার মতো হয়েছিল। চারপাশের সবাই বলত, “তুমি পাগল হয়ে গেছ। এর পেছনে এত সময় ব্যয় করছ কেন? তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না”, কিন্তু থেমে যাননি জিমি। টানা কাজ করে গেছেন। দিনরাত এক করে ভিডিও বানিয়েছেন। কেউ তখন তাকে দেখত না। কিন্তু তবু বানাতেন। বিশ্বাস ছিল, একদিন সফল হবেন। আজ তিনি সফল!
তবে তার স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। তিনি জানিয়েছেন, তার লক্ষ্য আরও বড় এবং ভালো ভিডিও বানানো। আরও বেশি মানুষকে সাহায্য করা।
এদিকে, ৪০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের অভূতপূর্ব এই অর্জন উদযাপন করতে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে তৈরি করেছে একটি নতুন প্লে বাটন—যা দেওয়া হয়েছে মিস্টার বিস্ট। ইউটিউবের সিইও নীল মোহন নিজেই তাকে হাতে তুলে দেন এই সম্মাননা।
সাধারণত ইউটিউব কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ১ লাখ, ১০ লাখ, বা ১ কোটি সাবস্ক্রাইবার পার হলে সিলভার, গোল্ড বা ডায়মন্ড প্লে বাটন প্রদান করা হয়। কিন্তু মিস্টার বিস্টের ৪০০ মিলিয়নের রেকর্ডের জন্য বানানো হয়েছে একেবারে আলাদা ডিজাইনের একটি পুরস্কার—ধাতব ফ্রেমে ঘেরা এবং মাঝে বসানো হয়েছে উজ্জ্বল নীল রঙের রত্নখচিত অংশ।
সামাজিক মাধ্যমে সেই বিশেষ পুরস্কারের ছবি শেয়ার করে মিস্টার বিস্ট লেখেন, “৪০০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার প্লে বাটন! ধন্যবাদ ইউটিউব।”
সিইও নীল মোহন এক্সে লিখেছেন, “তুমি এত দ্রুত বড় হচ্ছো যে তোমার জন্য নতুন অ্যাওয়ার্ড বানাতে হলো!”
২০২৫ সালের ১ জুন মিস্টার বিস্টের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা হয় ৪০০ মিলিয়ন। টি-সিরিজকে পেছনে ফেলে বর্তমানে বিশ্বের সেরা ইউটিউবার জিমি। টি-সিরিজের বর্তমান সাবস্ক্রাইব ৩০০ মিলিয়ন। ১ জুন জিমি লিখেছেন, “৪০০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার! ১০ বছর আগে আমাকে সবাই বলেছিল, আমি কখনো সফল হতে পারব না। তারপরেও আমি কনটেন্ট বানিয়েছি। কেউ দেখেনি, তবু ৭ বছর ধরে কাজ করেছি।”
এক পোস্টে মিস্টার বিস্ট তিনি লেখেন, “৪০০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার! দশ বছর আগে যখন আমি ইউটিউবে ছিলাম, সবাই বলত আমি খুব বেশি ‘অবসেসড’। তখন আমি মাকে বলেছিলাম—আমি গৃহহীন থাকলেও ঠিক আছে, কিন্তু আমি অন্য কিছু করব না। আজ আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে—এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। ইউটিউব ও তোমাদের (দর্শক) জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।”
২০২৫ সালের মে মাসে এই ইউটিউবারের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৩০-এর নিচে বয়সীদের মধ্যে তিনিই বিশ্বের কনিষ্ঠ স্ব-নির্মিত বিলিয়নিয়ার।
তার কোম্পানি বিস্ট ইন্ড্রাস্ট্রিজ ২০২৪ সালে আয় করেছে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার, যা এ বছর দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ইউটিউব ছাড়াও তার রয়েছে বার্গার চেইন, স্ন্যাকস ব্র্যান্ড, টেক বিনিয়োগ ও দাতব্য প্রকল্প—সব মিলিয়ে তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অনলাইন উদ্যোক্তাদের একজন।



ইউটিউবে মিস্টার বিস্ট’র সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি
২৭ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ‘সেলফ বিলিয়নিয়ার’ এই ইউটিউবার