বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক চিকিৎসাগত মানদণ্ড অনুযায়ী ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’র শামিল। ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি শিশুর রক্তে সীসার উচ্চ উপস্থিতি রয়েছে, যা তাদের শৈশবেই বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ) কমিয়ে দিচ্ছে এবং স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতিসাধন করছে। ইংরেজি দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
২০২০ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশকে বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তা সত্ত্বেও দেশে এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় রক্ত পরীক্ষা কর্মসূচি চালু হয়নি এবং দূষণকারী শিল্পগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
আইসিডিডিআর,বি-র ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ২ থেকে ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর ওপর করা এক গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রতিটি শিশুর রক্তেই সীসার ক্ষতিকর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শনাক্তের হার শতভাগ।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বি-র সহকারী বিজ্ঞানী ডা. জেসমিন সুলতানা জানান, ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তেই সীসার মাত্রা মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সীসা-সংশ্লিষ্ট শিল্প এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার পরিমাণ, পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকা শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। এর আগে ঢাকার স্কুলগামী শিশুদের ওপর করা অন্য এক গবেষণায় প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চ মাত্রায় সীসা পাওয়া গিয়েছিল।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে সীসাযুক্ত পেট্রোল নিষিদ্ধ করলেও বর্তমানে দূষণের প্রধান উৎসগুলো ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রধান উৎস হলো ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি অনানুষ্ঠানিকভাবে বা অবৈধভাবে রিসাইক্লিং করা। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়াই এসব ব্যাটারি ভেঙে সীসা গলানো হয়, যার ফলে মাটি ও বাতাসে বিষাক্ত সীসা ছড়িয়ে পড়ছে। ঢাকার ইসলামবাগ এবং কামরাঙ্গীরচর এই দূষণের অন্যতম হটস্পট।
আইসিডিডিআর,বি-র এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমই শিশুদের মধ্যে এই বিষ ছড়ানোর প্রধান উৎস। এই সংকট সমাধানে অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং সুরক্ষিত রিসাইক্লিং জোন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।”
এছাড়াও সীসা দিয়ে ঝালাই করা টিনের ক্যান, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সিরামিক কারখানা, সিমেন্ট কারখানার নির্গমন এবং আবাসিক এলাকায় সীসাযুক্ত রঙের ব্যবহারও এই দূষণের জন্য দায়ী। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ডা. ফাহমিদা খানম জানান, সাধারণ গৃহস্থালি রঙে সীসার সর্বোচ্চ সীমা ৯০ পিপিএম নির্ধারণ করা হলেও শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রঙের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর শরীরে প্রবেশ করার পর সীসা মূলত ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করে এবং প্রাথমিক স্নায়বিক বিকাশে বাধা দেয়। মস্তিষ্কের 'প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স' অংশটি সীসার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মানুষের আবেগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। শৈশবে এই ক্ষতি হলে তা আর কখনো নিরাময় করা সম্ভব হয় না। রক্তে সীসার উচ্চ মাত্রা সরাসরি শিশুর আইকিউ কমিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে তাদের মধ্যে আক্রমণাত্মক ও সমাজবিরোধী আচরণের জন্ম দেয়।
এর আগে ২০১৯ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও আইসিডিডিআর,বি-র যৌথ গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, রান্নায় ব্যবহৃত গুঁড়ো হলুদের রঙ আকর্ষণীয় করতে ‘লেড ক্রোমেট’ নামের বিষাক্ত উপাদান মেশানো হতো। ওই গবেষণা প্রকাশের পর সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে মাত্র দুই বছরের মধ্যে হলুদে সীসার ভেজাল দেওয়ার হার শূন্যে নেমে আসে। তবে ব্যাটারি খাতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ এবং লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের কারণে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যাপক চাহিদাই এই দূষণ বন্ধের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন গবেষকরা।



