জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অছাত্রদের রুম থেকে বের করা, গণরুম বিলুপ্তি ও মিনি গণরুমে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের আসন নিশ্চিতকরণের দাবিতে আটদিন অনশন করেছেন সামিউল ইসলাম প্রত্যয় নামে এক শিক্ষার্থী। প্রশাসনের আশ্বাসে বৃহস্পতিবার অনশন ভাঙলেও, ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ফের কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সামিউল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “তিন দফা দাবিতে গত বুধবার রাতে অনশন শুরু করি। প্রশাসন আট দিন পর বৃহস্পতিবার দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে এখনও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে আমার ওপর হামলা হয়। আমার সঙ্গে থাকা প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদেরও মারধর করা হয়। আপাতত অনশন ভাঙলেও দাবি না মানলে কর্মসূচি দেব।”
মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সাব্বির আলম বলেন, “বেলা সাড়ে ১১টার সময় আমার ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পানি পান করে প্রত্যয় অনশন ভাঙে। আমরা দুজনেরি কয়েকটি শর্তে একটি চুক্তি করেছি। তার দাবিগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
কাগজে-কলমে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বহু আন্দোলন-প্রতিবাদ দেখেছে জাহাঙ্গীরনগর। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিভিন্ন হলে মাঝে-মধ্যে অছাত্রদের (সাবেক শিক্ষার্থী) হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তবে শেষ পর্যন্ত আর সেটি বাস্তবায়ন হয় না। অবৈধভাবে হলে অবস্থানকারীদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত। সে কারণে প্রশাসন তাদের সামনে ঠুঁটো জগন্নাথ।
জাবিতে পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে নয়টি হল। হলগুলোতে ধারণক্ষমতার চাইতেও প্রায় দেড়গুণ বেশি ছাত্রের বসবাস। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নিয়মিত শিক্ষার্থীরা। হলগুলোতে অছাত্রদের আয়েশী বসবাসের কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
তথ্য বলছে, জাবির ছাত্র হলগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৫,৬৪০। কিন্তু বসবাস প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থীর। এর বাইরে ক্ষমতা ও জ্যেষ্ঠতার জোরে অবৈধভাবে থাকছেন প্রায় পাঁচশ অছাত্র।
অছাত্রদের রুম থেকে বের করাসহ তিন দাবিতে অনশন করছেন ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম/ঢাকা ট্রিবিউনএই সঙ্কট নিরসনে প্রশাসনের পদক্ষেপ আশ্বাসে এসেই থেমেছে বার বার। বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ নিয়মিত শিক্ষার্থীরা।
তাদের দাবি, সিটের বড় একটি অংশ দখলে রেখেছে অছাত্ররা। তাদের সরালে এ সংকট কিছুটা নিরসন হতে পারে। সব নিয়মিত শিক্ষার্থীর জন্য আসন নিশ্চিতের দাবিও জানান তারা।
দখলে যারা
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ ও ৪৪ ব্যাচের সব শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই হলে থাকছেন। এ তালিকায় আছেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন। পোষ্য কোটায় ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হয়েও থাকছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে। হলটির ৩৪৭ নম্বর (চারজনের কক্ষ) কক্ষে একাই থাকেন তিনি। এ বিষয়ে কথা বলতে হাবিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে জাবি ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, “আমার জানামতে হলে অবস্থানকারীদের পুরনো শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই এমফিল বা অন্য কোনো বিষয়ে ভর্তি আছে। এরপরেও খোঁজ নিয়ে কোনো হলে বসবাসকারী অছাত্র কাউকে পাওয়া গেলে তাকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পোষ্য কোটায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের হলে সংযুক্ত থাকেন; কিন্তু তারা হলে আসন পান না। হাবিবুর রহমান পোষ্য কোটায় কিনা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।”
কোন হলে কতজন অছাত্র
সূত্রের তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে দেড় শতাধিক অছাত্র রয়েছেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে প্রায় অর্ধশত, মীর মশাররফ হোসেন হলে শতাধিক, শহীদ সালাম-বরকত হলে ৬০-৭০ জন, আ. ফ. ম. কামালউদ্দিন হলে অর্ধশতাধিক, মওলানা ভাসানী হলে শতাধিক, আল বেরুনী হলে অর্ধশতাধিক, শহীদ রফিক জব্বার হলে দেড় শতাধিক অছাত্র রয়েছেন।
এ বছরের এপ্রিলে হলে থাকা সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে তাদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
দুর্ভোগে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, হলে অছাত্রদের অবস্থানের কারণে তারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এমনকি এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষাজীবনেও।
প্রতিটি হলেই চালু আছে গণরুম। যেখানে ৩০-৭০ জন করে শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকছেন। এছাড়া দুই বেডের কক্ষে মিনি গণরুম করে থাকছেন ৬-৮ জন।
দর্শন বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ বলেন, “এক রুমে আমরা ৪৬ জন থাকি। তীব্র গরমে টিকতে পারি না। দিনে রাতে কখনোই ঘুম হয় না। সবসময় কোলাহল থাকে। পড়াশোনা হয় না।”
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসার সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা/ঢাকা ট্রিবিউনজাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ইমতিয়াজ অর্ণব বলেন, “হলে একটি চক্র তৈরি করেছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের হল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা আসলে হলের নিজের কক্ষে উঠতে পারে শেষ বর্ষে গিয়ে। তারাই পরে আরও লম্বা সময় হলে অবস্থান করে। ফলে পুরো ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে। এসব অছাত্রদের বের করতে হবে। এটি করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হতো।”
আন্দোলন হয়, আশ্বাস আসে, বাস্তবায়ন হয় না
আবাসন সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে নেমেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যুক্ত হয়েছে কয়েকটি ছাত্র সংগঠনও।
তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবারই সংকট নিরসনে আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি বিভিন্ন সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি ও মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “তিন দফা দাবিতে বুধবার রাতে অনশন শুরু করি। প্রশাসন আশ্বাস দিলেও এখনও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে আমার ওপর হামলা হয়। আমার সঙ্গে থাকা প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদেরও মারধর করা হয়। তবুও আমি আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ইমতিয়াজ অর্ণব আরও বলেন, “আবাসন সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা আন্দোলন করেছি। সেখানে প্রশাসন আশ্বাস দেয়। কিন্তু ছাত্রলীগ প্রায়ই এসব আন্দোলনের বিপক্ষে থাকে। তাই কাদের জন্য এই পরিস্থিতি, তা পরিষ্কার।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন জলি বলেন, “কয়েকটি হল হয়েছে। তবুও সমস্যা কমছে না। কারণ অনেকেই ২-৩ বছর আগেই মাস্টার্স শেষ করলেও হল ছাড়েননি। হল প্রশাসন সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। আইনে আছে, পুরোনোরা চলে যাবেন, নতুনরা আসবেন। কিন্তু এখানে তা হচ্ছে না। সাবেক ছাত্ররা হল না ছাড়লে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগ করতে হবে। কারো যদি ড্রপ হয়, সে বাইরে থেকে পরীক্ষা দেবে। এতো টাকা দিয়ে, এতো গাছ কেটে হল বানানো হচ্ছে, তবুও যদি সংকট না কাটে, ছাত্ররা গণরুমে থাকে। তাহলে এগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আড়াই মাস আগে নোটিশ দিয়েছিল সাবেক ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে। কিন্তু এরপর আসলেই ওই ছাত্ররা হল ছাড়ল কি-না, সেটির তদারক হয়নি। এমনকি হল প্রশাসনের কাছে কোনো তালিকাই নেই অছাত্রদের। কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। এখানেই প্রশাসনকে ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এবার জাবি থেকে স্বর্ণপদক পাওয়া সবাই ছাত্রী। এর একটি বড় কারণ কিন্তু এই আবাসন। ছাত্ররা গণরুমে থাকার কারণে প্রথম বর্ষেই ফল খারাপ করে। সেটি আর তারা পুষিয়ে উঠতে পারেন না। মেয়েদের হলে এই সংকট না থাকায় তারা পড়াশোনা করতে পারছে। শিক্ষার জন্য এই পরিস্থিতি ঠিক করতে প্রশাসনকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।”
প্রশাসনের আশার বাণী
জাবি প্রশাসন জানায়, অধিকতর উন্নয়নের আওতায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য ছয়টি হল নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি নির্মাণ হয়ে গেছে। বাকি চারটি হয়ে গেলে আসন সংকট থাকবে না। সমস্যা নিরসনে এখন শুধু সময়ের প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ওবায়দুর রহমান বলেন, “গণরুম বিলুপ্ত ও যেসব দাবি উঠছে, তা বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন। আমরা কাজ করছি।”
হল কমিটির সভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার বলেন, “মোট কতজন অছাত্র হলে বাস করছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আমরা কাজ করছি। অছাত্ররা যেনো হলে অবস্থান না করতে পারে সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের নির্মাণাধীন হলের কাজ শেষ হলে আসন সংকট থাকবে না।”
হলে অছাত্রদের অবস্থানের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রভাব বিস্তার করে কি-না জানতে চাইলে, এ ধরনের কোনো তথ্য নেই বলে দাবি করেন দায়িত্বশীল এই শিক্ষক।
সার্বিক বিষয়ে জাবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল আলম বলেন, “অছাত্রদের তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবাসন সংকট সমাধানে কাজ চলছে।”



