বাংলাদেশে বন্যা একটি নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ এমন এক দুর্যোগ, যার প্রভাব রয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদে। নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হয় বন্যাদুর্গত এলাকায়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরাটা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকার ধানমণ্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. সাইফ হোসেন খান বলেন, “বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর মানুষ যখন নিজের বসতবাড়িতে ফিরতে শুরু করেন, সেই সময়টায় সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে কিছু বিষয়ে সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
শুধু যে বন্যার্ত মানুষই এ ঝুঁকিতে থাকেন, তা নয় বরং বন্যায় উদ্ধারকর্মী, ত্রাণকর্মী, স্বাস্থ্যসেবাদানকারীও ঝুঁকিতে থাকেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে

পানিবাহিত রোগের সংক্রমণ
বন্যার পানি সাধারণত ময়লা ও দূষিত। বন্যায় নিরাপদ পানির অভাবে অনেকেই দৈনন্দিন কাজে অনিরাপদ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। আবার নর্দমা ও ড্রেনেজ লাইনের পানি উপচে নিরাপদ পানির উৎসকে দূষিত করে। ফলে পানিবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিস এ, লেপটোস্পাইরোসিস বেড়ে যায়।
বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া
বন্যায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার সবচেয়ে বেশি থাকে।
মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ
বন্যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। ফলে এসকল জায়গায় পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াও বেড়ে যায়। পাশাপাশি সাপের প্রকোপ বেড়ে যায়।
ছত্রাকজাতীয় রোগ
বন্যাদূর্গত এলাকায় দীর্ঘক্ষণ হাত-পা ভেজা থাকার কারণে চামড়ায় ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণ হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে একসঙ্গে অনেক মানুষ থাকায় ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণ একজন থেকে অন্যজনের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত ফুসফুসের সংক্রমণ এই সময়ের খুব সাধারণ একটা সমস্যা। আক্রান্ত ব্যক্তিরা কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য ও পানির সংকট এবং রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশা দেখা দিতে পারে। এই মানসিক সমস্যাগুলো অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যদি তা সময়মতো মোকাবিলা না করা হয়।
অপুষ্টি
বন্যা ও পরবর্তী সময়ে দুর্গত এলাকায় খাবারের অপ্রতুলতা, ফসলের মাঠের ক্ষতি, গবাদিপশু ও পুকুরের মাছে ভেসে যাওয়ায় খাদ্যসংকট দেখা দেয়। ফলস্বরূপ মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়
বন্যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আমরা পুরোপুরি এড়াতে পারি না। অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে পানি ঢুকে যাওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়। এজন্য আগে থেকে বন্যার মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া ও স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া জরুরি। সে ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। কিছু প্রতিকার মাথায় রাখতে হবে।
যেমন-
১. বন্যার পর পরই নানা রকম রোগ (টাইফয়েড, ডাইরিয়া, আমাশয় ইত্যাদি) দেখা দিতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধ প্রতিষেধক নিতে হবে এবং অবশ্যই খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে।
২. পরিচ্ছন্নতা মানতে হবে, খাবারের আগে, রান্নার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুতে হবে।
৩. দৈনন্দিন কাজে নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে। নিরাপদ পানি না থাকলে পানি ফুটিয়ে অথবা ক্লোরিন দিয়ে ব্যবহার করতে হবে।
৪. পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও জরুরি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখতে হবে।
৫. শিশুদের নিরাপদে রাখতে হবে। তারা যেন পানিতে পড়ে না যায়, সে বিষয়ে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।



