বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার অন্যতম একটি প্রস্তাব হলো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রণয়ন। দলটির মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যমান সংসদীয় কাঠামোর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষ আইনসভায় দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী এবং প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমাতে এবং জাতীয় ঐক্য বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে দেওয়া ৬২টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রণয়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি মতে, দ্বিকক্ষ আইনসভা প্রচলিত হলে সরকারি দল স্বৈরাচারী আচরণ দেখাতে পারবে না। সম্প্রতি বিএনপির ৩১ দফা নিয়ে ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে আমরা সংবিধানে কিছু সংস্কার আনতে চাই। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই। রাষ্ট্র পরিচালনায় সমাজের জ্ঞানী-গুণীদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দ্বিকক্ষ পার্লামেন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাই।”
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে। দ্বিকক্ষ আইনসভার কাঠামো সাধারণত দুটি স্তরে বিভক্ত থাকে। নিম্ন কক্ষটি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়, যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, উচ্চ কক্ষটি বিভিন্ন অঞ্চল, জাতিগোষ্ঠী এবং বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে গঠিত হয়, যা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার “প্রতিনিধি পরিষদ” এবং “সিনেটে”র সমন্বয়ে গঠিত, যা দেশটির নীতি-নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। একইভাবে, ভারতের দ্বিকক্ষ আইনসভার “লোকসভা” এবং “রাজ্যসভা” নিয়ে গঠিত, যা কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এসব দেশের প্রেক্ষাপট থেকে বলা যায় যে, দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাই করে না, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের এবং জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার গুরুত্ব তুলে ধরে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শেখ হাসিনার মত দৈত্য, আরেকটা দৈত্য যাতে সৃষ্টি না হয়, এজন্য ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দ্বিকক্ষ পার্লামেন্ট গঠন করা হবে।”
বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষ সংসদ প্রয়োজন রয়েছে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। পলিসি মেকিং-এর ক্ষেত্রে বিতর্কের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাধানে পৌঁছানো যাবে। আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জ্ঞানী ব্যক্তিরা সাধারণত নির্বাচন করতে চান না। দ্বিকক্ষ সংসদ চালু হলে তারাও ভূমিকা রাখতে পারবে।”
কোন প্রক্রিয়ায় উচ্চ কক্ষের সদস্য নির্বাচন করা হবে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটা এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এখনো আমরা জানি না কোন ফর্মেটে দ্বিকক্ষ সংসদ গঠন করা হবে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে জানা যাবে কীভাবে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন করা হবে।”
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি দ্বিকক্ষ সংসদের মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, অঞ্চল এবং গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারকে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চায়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। দলটির নেতারা বলেছেন, আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশে দ্বিকক্ষ আইনসভার প্রচলন করা হবে।
বিএনপির নেতাদের মতে, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এবার তার উত্তরসূরি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। যার অংশ হিসেবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা হবে।
বিএনপি নেতাদের দাবি, বর্তমান এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদে সরকারের পর্যাপ্ত জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। দ্বিকক্ষ সংসদ চালু হলে একটি কক্ষ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি কক্ষের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে পারবে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এছাড়াও, দ্বিকক্ষ সংসদের উচ্চ কক্ষ সাধারণত বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতামত ও স্বার্থ সংসদে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে। একইসঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা তাদের সমস্যা, চাহিদা এবং উন্নয়ন নিয়ে সরাসরি মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সংসদ বাংলাদেশেও প্রয়োজন। এতে সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারবে। দ্বিকক্ষ সংসদ চালু হলে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য বাজায় থাকবে। এতে কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে পারবে না। অতীতে আমরা দেখেছি শেখ হাসিনা কীভাবে স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিলেন। এই ধনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে রক্ষা পেতে দ্বিকক্ষ সংসদ প্রয়োজন। ফলে কেউ চাইলেই যেকোনো আইন সংসদে পাশ করাতে পারবে না। এতে উচ্চকক্ষের সমর্থন লাগবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও আয়তনে ছোট দেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অতিরিক্ত আরেকটি কক্ষ পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যা দেশের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একইসঙ্গে, এ ধরনের আইনসভা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। দ্বিকক্ষ আইনসভা কার্যকর করার আগে এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা এবং সর্বদলীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা আবশ্যক বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্বিকক্ষ সংসদ প্রণয়নে রাজনৈতিকদলগুলো ঐক্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “দ্বিকক্ষ সংসদ জনগণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে। সবাই মনে করে দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী করতে দ্বিকক্ষ সংসদ প্রণয়ন করা প্রয়োজন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বেশকিছু রাজনৈতিক দল দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের দাবি তুলছে। যদি সেটি প্রচলন হয় তাহলে তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আর প্রয়োজন হবে। উচ্চকক্ষ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তবে এখন পর্যন্ত দ্বিকক্ষ সংসদ নিয়ে কোনো দল কোনো রূপরেখা দেয়নি। তারা কোন মডেলে দ্বিকক্ষ সংসদ চালু করবে সেটি আগে পরিষ্কার করতে হবে। তবে দ্বিকক্ষ সংসদ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”