সিলেটের ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় লুটের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাড়াও বিভিন্ন দলের ৪২ নেতার তালিকা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তালিকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছয় শীর্ষ নেতা নাম রয়েছে।
এদিকে, বিএনপি ও এনসিপি প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ে নামার হুমকি দিয়েছে। জামায়াত বলেছে, প্রকৃত দোষীদের আড়াল করতেই তালিকায় তাদের নাম ঢুকানো হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনসহ সচেতন মানুষজন প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের দাবি তুললেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রকাশিত রিপোর্টে “নির্দোষ” মানুষকেও জড়ানো হচ্ছে।
গত বুধবার (২০ আগস্ট) একটি জাতীয় দৈনিকে ৪২ জন রাজনৈতিক নেতার তালিকা প্রকাশিত হয়। তালিকা দেখে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াত ও এনসিপি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
অন্যদিকে, মহানগর বিএনপিও বুধবার সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে। তাদের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকের নাম রিপোর্টে যুক্ত করা হচ্ছে, যা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে ফেলতে পারে।
সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর চুরির সঙ্গে জড়িত থাকা ৪২ জন স্থানীয় ব্যক্তি চিহ্নিত হয়েছেন। তালিকায় বিএনপির ২০ জন, আওয়ামী লীগের সাতজন, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির দুজন করে এবং স্থানীয় ১১ জন ব্যক্তি রয়েছেন।
বিএনপির ২০ জন নেতাকর্মী হলেন: সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিন, সদস্য হাজি কামাল, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান লাল মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে দুদু, সিলেট জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রুবেল আহমেদ বাহার, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মুসতাকিন আহমদ ফরহাদ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. দুলাল মিয়া ওরফে দুলা, যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন, সাজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কর্মী জাকির হোসেন, সদস্য মোজাফর আলী, মানিক মিয়া, সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকসুদ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ওরফে শাহ পরান, কোষাধ্যক্ষ (বহিষ্কৃত) শাহ আলম ওরফে স্বপন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম এবং পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বক্স।
আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মী হলেন: সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কর্মী বিলাল মিয়া, শাহাবুদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল ওদুদ আলফু, কর্মী মনির মিয়া, হাবিল মিয়া ও সাইদুর রহমান।
জামায়াতের দুই নেতা হলেন: সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মো. ফখরুল ইসলাম এবং সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন।
এনসিপির দুই নেতা হলেন: সিলেট জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগর প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
১৯৯৬ সাল থেকে পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞ শুরু
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলোতে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু হয়। তখন থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ পরিবেশ ধ্বংস। শাহ আরপিন টিলা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি, লোভাছড়া, শ্রীপুর ও রাংপানি এলাকায় নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে প্রকৃতি ক্ষত-বিক্ষত হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রিটের প্রেক্ষিতে ২০২০ সাল থেকে কোয়ারিগুলোতে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়। পরবর্তীতে সনাতন পদ্ধতিতে কোয়ারি খোলার দাবিতে আন্দোলন হলেও উচ্চ আদালত থেকে অনুমোদন মেলেনি।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারিগুলোতে প্রশাসনের নাগের ডগায় ফের নির্বিচারে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। ৫ আগস্টের অব্যবহিত পর বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন বাংলাদেশ রোপওয়ের সংরক্ষিত এলাকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এলাকাটিকে বানানো হয় বিরানভূমি। নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে সিলেট বিভাগের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু ধলাই সেতুকে ফেলা হয় হুমকির মুখে। সাদা পাথর, জাফলং ও বিছনাকান্দি থেকে তখনও পাথর চুরি হতে থাকে। জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলোতে এ নিয়ে প্রকাশিত হয় সচিত্র প্রতিবেদন। তখন অভিযোগ উঠেছিল, সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বরত বাহিনীকে ম্যানেজ করে দুর্বৃত্তচক্র পাথর উত্তোলন করছে।
ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে ও ধলাই ব্রিজ রক্ষায় বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সে সময় লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি জোরালো কোনো পদক্ষেপ। সম্প্রতি উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে এলে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকা থেকে নৌকা দিয়ে পঙ্গপালের মতো পাথর লুট শুরু হয়। সাদা পাথর এলাকাকে পরিণত করা হয় বিরানভূমিতে। এরপর টনক নড়ে প্রশাসনের। সাদা পাথর রক্ষায় নেওয়া হয় জোরালো পদক্ষেপ।
সাদাপাথর সংলগ্ন এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর নেতৃত্বেই মূলত পাথর লুট হয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় লোকজনের বিরুদ্ধে পাথর চুরির যে ঢালাও অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা কোয়ারি সংলগ্ন গ্রামসমূহের মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কোয়ারি সংলগ্ন গ্রামগুলো এখন পুরুষশূন্য। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকলক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার অনেক নিরীহ লোকও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অবশ্য সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার রেজা-উন-নবী খান গত বুধবার কোম্পানীগঞ্জ পরিদর্শন করে বলেছেন, তদন্ত করে সাদা পাথর লুটের প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে। কোনো নিরীহ লোককে হয়রানি করা হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা জলিল মিয়া জানান, বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্যের পরও স্থানীয় লোকজন আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে অজানা এক আতঙ্ক। এ আতঙ্ক দূরী করতে উদ্যোগী হতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলকে।



পাথর লুট নিয়ে দুদকের প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জামায়াত-এনসিপির
পাথর লুটে জড়িতদের তালিকাসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা