১৮৮৬ সালের ১ মে। শিকাগোর হে মার্কেট চত্বরে জমায়েত হয়েছিলেন হাজার হাজার শ্রমিক। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠছিল - 'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা বিনোদন'। কিন্তু সেই ন্যায্য দাবির বিপরীতে জোটে পুলিশের লাঠি আর নির্বিচার গুলি। রাজপথ ভিজে যায় শ্রমিকের রক্তে। সেই রক্তের পথ ধরেই একদিন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পায় শ্রমের মর্যাদা। আজ এতো বছর পর মে দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং তা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের এক ইশতেহার।
১৮৮৬ সালের সেই আন্দোলনের পর ১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১মে কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ব মানচিত্রে শিকাগোর সেই আত্মত্যাগ এক নতুন সমতার বার্তা নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন যে কোটি কোটি শ্রমিক, তাদের কাছে মে দিবস এক বিশেষ অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, চা বাগান এবং নির্মাণ খাতে নিয়োজিত বিশাল এক জনশক্তি আজ দেশের উন্নয়নের মূল কারিগর। কিন্তু এখনও দেশের কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সংবাদপত্রভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নিহত ১৮৬ শ্রমিকের মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ ও ১ জন নারী। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে পরিবহন খাতে। কৃষিতে ১৯, নির্মাণে ১৪, প্রবাসী শ্রমিক ১১, দিনমজুর ১১, মৎস্য খাতে ৯, বিদ্যুৎ খাতে ৬ এবং অন্যান্য খাতে ৯ জন নিহত।
এজন্য কিছু বিষয় শ্রমজীবী মানুষদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে-
নিরাপদ কর্মপরিবেশ: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর অনেক পরিবর্তন এলেও ছোট ছোট কারখানাগুলোতে আজও অগ্নি-নির্বাপক ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে।
মজুরি বৈষম্য: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিতর্ক আজও অমলিন।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত: গৃহকর্মী বা রিকশাচালকদের মতো বিশাল একটি গোষ্ঠী আজও মে দিবসের আনুষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন।
এবারের প্রতিপাদ্য
এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য 'সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত'। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
তিনি বলেন, "শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষ যেকোনো দেশের উন্নয়ন আর সমৃদ্ধি প্রধান অবলম্বন। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার।"
কর্মসূচি
মহান মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা।
শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশ করবে বিএনপি। বেলা দুইটায় অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন বেলা তিনটার দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে পৃথক সমাবেশ করবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান।
পৃথক সমাবেশ করবে ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশ। সকাল নয়টায় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। এ ছাড়া বেলা তিনটায় শাহবাগে জাতীয় শ্রমিক শক্তির সমাবেশে বক্তব্য দেবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
পরিশেষে শুধু এটুকু বলতে চাই, মে দিবস তাই শুধুমাত্র স্মরণের উদ্দেশ্যে না হয়ে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সমাজের সকলের সামনে প্রশ্ন রাখার দিন, আমরা কি সত্যিই শ্রমিকের ঘামকে মূল্য দিচ্ছি?
শ্রমিকের মর্যাদা কেবল নির্দিষ্ট একটি দিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নয়, এটি হতে হবে বাস্তব নীতিনির্ধারণে, ন্যায্য মজুরিতে ও আর্থ সামাজিক সুরক্ষায় প্রতিফলিত।



