বাংলাদেশে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঢাকা-বেইজিং রাজনৈতিক স্তরের যোগাযোগ আরও নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগামী জুনের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিং সফরে নিতে অত্যন্ত আগ্রহী চীন। বেইজিংয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই রাষ্ট্রীয় সফরটি দুই দিনের বেশি হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফরের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত না হলেও প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে। খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং পৌঁছানোর একই দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করতে পারেন।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই চীন সফরে যাবেন। চীন বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উন্নয়ন অংশীদার। তিনি সুবিধাজনক সময়ে এই সফর সম্পন্ন করবেন।”
এর আগে গত ৮ মে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত আলোচনা সভায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ সবসময় চীনকে পাশে পাবে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ দ্রুত বাড়ছে। গত মাসে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বেইজিং ও চীনের একাধিক প্রদেশ সফর করেন। এরপর গত ৬ মে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পায়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত চালু করা। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন। গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম রুটে সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালু করা।
পাশাপাশি, চীন এখন দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বাইরে আঞ্চলিক কাঠামোতেও ঢাকাকে যুক্ত করতে আগ্রহী। ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে বাংলাদেশ, চীন ও মায়ানমারকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় উদ্যোগের জন্য বেইজিং ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ দেয়। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাতে সরাসরি সম্মতি দেয়নি। পরবর্তীতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের মাধ্যমে বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান ও মায়ানমারকে যুক্ত করে একটি ‘চার দেশীয় আঞ্চলিক ফোরাম’ গঠনের নতুন প্রস্তাব সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি নতুন নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই আঞ্চলিক জোটের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা এখনই কোনো নতুন জোটে যোগ না দিয়ে কিছুটা সময় নেওয়ার পক্ষে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা ‘সার্ক’-কে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করার ওপর জোর দিচ্ছে, তখন নতুন কোনো ব্লকে ঢোকার আগে সবদিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



