সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ভিডিও নজরদারির আওতায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের মোবাইল ফোনে মামলা ও দণ্ড সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। একে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এর আদলে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে বিভিন্ন নম্বর থেকে মামলা ও জরিমানার মেসেজ দেওয়া হচ্ছে পরিবহন মালিকদের।
এরমধ্যে অন্তত কয়েকজন পরিবহন মালিকের মুঠোফোনে আসা জরিমানা সংক্রান্ত মেসেজের স্ক্রিনশট ঢাকা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
শনিবার (২২ মে) বিকেল ৩টার দিকে সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা, তার ফোনে এ ধরনের একটি মেসেজ পান। যেখানে উল্লেখ করা হয়, সাভারে তার গাড়িটি নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। অথচ, সেদিন তার গাড়িটি ছিল ঢাকায়।
তিনি বলেন, “আমার গাড়ি সাভারে ছিল না। কিন্তু মামলা হয়েছে সাভারে। ওয়েবসাইটে ঢোকার পর খটকা লাগায় বিআরটিএ’তে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মেসেজটি ছিল ভুয়া।”
একইরকম মেসেজ পেয়েছেন সাভারের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন খান আনু। তিনি বলেন, “আমি প্রায় ৫ মাস ধরে আমার গাড়ি বের করিনি। হঠাৎ এমন মেসেজ পাই। আমি তো টাকা দেবো ভেবে সাইটে ঢুকে দেখি এটি সম্পূর্ণ ভুয়া।”
ভুয়া মামলা ও জরিমানার তথ্য পাঠানোর মেসেজের সঙ্গে যে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে, সেটির সঙ্গে বিআরটিএ এর মিল পাওয়া যায়নি। কারণ, বিআরটিএ বা সরকারি যেকোনো ওয়েবসাইটের শেষে .gov.bd এমন লেখা থাকে। কিন্তু এসব মেসেজে তা অনুপস্থিত। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ–এর লোগো ব্যবহার করে এ ধরনের মেসেজ পাঠানো হচ্ছে।
মেসেজে ভয় দেখিয়ে বলা হচ্ছে, ট্রাফিক ক্যামেরায় গাড়ির গতিসীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং এজন্য জরিমানা দিতে হবে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে শাস্তি হবে এবং তথ্য জাতীয় ডাটাবেজে যুক্ত করা হবে বলেও মেসেজে লেখা থাকছে।
জরিমানা দেওয়ার জন্য একটি ভুয়া লিংকও পাঠানো হচ্ছে, যেখানে .online বা .icu ধরনের ডোমেইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব লিংকে ঢুকলে ব্যাংক তথ্য, কার্ড নম্বর বা OTP চুরির ঝুঁকি থাকে।
যেভাবে বুঝবেন মেসেজটি ভুয়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটু সতর্ক থাকলেই এ ধরনের প্রতারণা এড়ানো সম্ভব। ভুয়া মেসেজগুলো সাধারণত বাংলাদেশের সরকারি নম্বর থেকে নয়, বিদেশি নম্বর- যেমন +63 কোড থেকে আসে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সাকের উজ্জামান বলেন, “যেসব নম্বরগুলো থেকে মেসেজ দেওয়া হয়েছে, এগুলো ইন্টারন্যাশনাল ডায়াল কোড অনুযায়ী ফিলিপাইনের ডায়াল কোড। বিআরটিএ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তারা তাদের নম্বর থেকে মেসেজ পাঠিয়ে থাকে। ফলে মেসেজের প্রেরক নম্বর থেকেই স্পষ্ট এটি এক ধরনের প্রতারণা। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের সকল ওয়েবসাইট ডট জিওভি (gov) ডট (bd) দিয়ে নিবন্ধিত। এখানে যে ওয়েবসাইটের তথ্য দেওয়া হয়েছে সেটিও একটি নকল ওয়েবসাইট। গ্রাহকদের উচিত এই ধরনের প্রতারণা থেকে মুক্তিতে সরাসরি বিআরটিএ’তে যোগাযোগ করা। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচিত এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে রাষ্ট্রের প্রচারণা, সচেতনতা ও একইসঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিআরটিএ তার নিজস্ব নম্বর থেকে মেসেজ দিয়ে থাকে। এ ধরনের নম্বর বিআরটিএ এর নয়। এআই মামলা ঢাকা মহানগরে শুরু হয়েছে।”
তবে সাভার বা ঢাকা জেলায় এ ধরনের মামলার কোনো কার্যক্রম এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের মামলার কোনো ঘটনা নেই। এই মেসেজ প্রতারণার কৌশল হতে পারে। সাধারণ মানুষ যাতে এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদে না পড়েন। আর লেনদেন করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে। একটা বিষয় এআই দিয়ে কোনো মামলা এই অঞ্চলে শুরু হয়নি। ফলে এ ধরনের মেসেজেরও কোনো সুযোগ নেই।”



এআই ট্রাফিক ক্যামেরায় এক সপ্তাহে ৩ শতাধিক মামলা
বাইকার এবং চালকদের এআই মামলা থেকে বাঁচাবে যে ৫টি উপায়