ঢাকার তুরাগ নদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীর মরদেহ ভাসছে-সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ার পর সংশ্লিষ্ট থানা, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সাতজন নিখোঁজ কিংবা তিন-চারটি মরদেহ উদ্ধারের দাবির পক্ষে কোনো তথ্য মেলেনি।
শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, “তুরাগ নদীতে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ” শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও। কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত এ ধরনের অপপ্রচারে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। একই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ তৎপর রয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ প্রতিবেদক।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের আওতাধীন তুরাগ থানা, বাউনিয়া ও বিরুলিয়া পর্যন্ত এলাকায় ২২ জুন থেকে শনিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি।
ডিএমপির রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নোমান হোসেন বলেন, “২২ জুন থেকে শনিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নেই।”
ডিএমপির দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন বলেন, “নৌ-পুলিশ গত বুধবার আরিফ হাসান রাকিব নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় নিহতের চাচা বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।
আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বলেন, “সকালে আরিফ নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একইদিন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাটে কয়েকজন একসঙ্গে গোসলের সময় রনি নামের একজন ডুবে যায়। অন্যরা ঘন্টাখানেক চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলেন। রনির মৃত্যু হওয়ার ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।”
ডিএমপির তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ওইদিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়।”
তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবও ২২ জুনের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে তার মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়।
আরিফের চাচা বলেন, “২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আরিফ। ওইদিন বিকেল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল। বুধবার তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না কিভাবে সে মারা গেছে। মামলা করতে চাইনি। একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই মামলা করছি। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারতো না আরিফ।”
অন্যদিকে রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা রনি মোল্লার (৩৫) মৃত্যুর ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বলেন, “উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন রনি। ২৪ জুন রনির মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি গোসল করার সময় সে মারা গেছে। হোটেলের লোকজন জানিয়েছে ওইদিন সকালে রনি হোটেল থেকে বের হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “রনির মানসিক একটু সমস্যা ছিল, যখন মন চাইতো এদিক সেদিক চলে যেত। কোনো রাজনীতির সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিল না।”
রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমনের বয়স ১৭ বছর। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি। শুক্রবার আশুলিয়া থানা পুলিশ তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
শনিবার দুপুরে রানাভোলায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসার একটি কক্ষে সুমনের বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন বসে আছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। কথা বলতে গেলেও চুপ থাকেন তারা। শান্তনা দেওয়ার পর কথা বলেন। তবে অধিকাংশ প্রশ্নে চুপ থাকেন। সুমন ২২ তারিখ থেকে নিখোঁজ ছিল কিনা এমন প্রশ্নে কোনো উত্তর দেননি। আত্মীয়স্বজনেরা কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করতে অনুরোধ করেন।
নিখোঁজ ছিল, এতটুকু উত্তর দিয়ে তাঁরা জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তারা লাশ নিয়ে আসেন। মোবাইল থেকে সুমনের সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। বাসায় থাকা ছবিগুলোও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সুমনের মোবাইল ভেঙে ফেলা হয়েছে। সন্তান হারানোয় মানসিক যন্ত্রণা বাড়বে তাই কোনো স্মৃতি রাখা হয়নি।
একপর্যায়ে ফেসবুকে ‘সুমন আহমেদ চৌধুরী’ (ইংরেজিতে) নামের একটি আইডি দেখানো হলে সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন প্রতিবেশী। তারা জানান, সুমন কামারপাড়া আড়তে কাচামালের ব্যবসা করত। আইডিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় দিন আগে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের পাশের এক চক থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহতের পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে তুরাগ নদীতে পরে যায়। সে সাঁতার জানতো না। পরিবারের সদস্যরা নদীতে খোঁজাখুজি করেছেন। নদীতে একটি লাশের কথাই আমরা জানি। আর অন্যান্য যে সব কথাবার্তা আসতেছে, ওগুলোর বিষয়ে আমাদের জানা নাই।”



