Sunday, September 20, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশে নির্মিত হচ্ছে প্রথম সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ

খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মাণাধীন এ জাহাজ ২০২৮ সালের মধ্যে প্রস্তুত হওয়ার কথা রয়েছে

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:২১ এএম

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মাণাধীন এ জাহাজ ২০২৮ সালের মধ্যে প্রস্তুত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি চালু হলে দেশের বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৩২ মিটার  দীর্ঘ, ৮ মিটার প্রস্থ (বিম) এবং ৪ মিটার ড্রাফটবিশিষ্ট জাহাজটির নকশা করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিল মেরিন। এতে ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও চীন থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাহাজটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম হবে।

জাহাজটিতে অত্যাধুনিক গবেষণাগার ও উচ্চপ্রযুক্তির সেন্সর থাকবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্রের খনিজসম্পদ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন।

গত ১৬ জুন খুলনা শিপইয়ার্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যেই এটি নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত ছোট মাছ ধরার নৌকার পরিবর্তে ভবিষ্যতে এ গবেষণা জাহাজ ব্যবহার করা হবে।

বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ বলেন, “বর্তমানে গভীর সমুদ্রের পরিবেশ ও সম্পদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির নেই। সমুদ্র গবেষণায় আমরা এতটাই পিছিয়ে যে, মানুষ এখন নিজেদের সমুদ্রের চেয়ে মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে বেশি জানে।”

তিনি আরো বলেন, “নতুন গবেষণা জাহাজটি এ সীমাবদ্ধতা দূর করতে সহায়তা করবে। উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত জাহাজটি গবেষকদের উপকূলীয় পর্যবেক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে গবেষণার সুযোগ দেবে।”

২০১২ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সামুদ্রিক এলাকায় সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এ সামুদ্রিক এলাকার আয়তন দেশের স্থলভাগের প্রায় সমান।

২০১৬ সালে কক্সবাজারের রামুতে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলেও গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে দেশ এখনো ব্লু ইকোনমির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি।

কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ বলেন, “স্থলভিত্তিক সম্পদ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদের গুরুত্ব আরও বাড়বে। সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ জরুরি। বর্তমানে মাছের প্রকৃত মজুদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই আহরণ চলছে।”

তিনি জানান, নতুন জাহাজের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বঙ্গোপসাগরে মাছের অবস্থান ও বিস্তৃতি শনাক্ত করতে পারবেন। পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, শৈবাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ নিয়েও গবেষণা করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটিতে ভাইব্রো কোরার, বক্স কোরার এবং অ্যাকুস্টিক ডপলার কারেন্ট প্রোফাইলার (এডিসিপি) থাকবে। এসব যন্ত্র সমুদ্রতলের মাটির নমুনা সংগ্রহ ও সমুদ্রস্রোত পরিমাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া বায়োলজিক্যাল, কেমিক্যাল ও এনভায়রনমেন্টাল ওশেনোগ্রাফি  গবেষণার জন্য আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জরিপ ও গবেষণা সরঞ্জাম সংযোজিত থাকবে। এতে সমুদ্র গবেষণা ও হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

জাহাজটিতে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্যের থাকার ব্যবস্থা থাকবে। তারা টানা আট থেকে ১০ দিন পর্যন্ত দিন-রাত গবেষণা অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।

এতে তিনটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগার - ওয়েট ল্যাব, ড্রাই ল্যাব এবং ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব থাকবে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে জাহাজ থেকেই গবেষণার তথ্য সরাসরি স্থলভিত্তিক সমুদ্রবিজ্ঞান তথ্যকেন্দ্রে পাঠানো যাবে।

তবে কমোডর শহীদ আহমেদ বলেন, “জাহাজটির আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় সব ধরনের আবহাওয়ায় এটি পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। ফলে বছরে তিন থেকে চার মাস গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।”

১৬০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের আওতায় গবেষণা জাহাজের পাশাপাশি দুটি উচ্চগতির কেবিন বোট, ৩৬ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রশস্ত একটি পন্টুন, ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি এবং একটি গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হবে। এসব স্থাপনা কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় স্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৮০০টির বেশি নতুন জাহাজ নির্মাণ এবং আড়াই হাজারের বেশি জাহাজ মেরামত করেছে।

খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মাকসুদ আলম এ প্রকল্পকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “এর আগে মৎস্য গবেষণা জাহাজসহ বিভিন্ন গবেষণা জাহাজ বিদেশে নির্মিত হয়েছে। তবে দেশে নির্মিত এই জাহাজ সামুদ্রিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একইসঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ ও সম্পদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।”

   

About

Popular Links

x