Saturday, August 01, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ফেলে দেওয়া কাঁঠালের বীজ থেকে ‘খনিজসমৃদ্ধ পুষ্টি উপাদান’, খাবারে দেবে বাড়তি পুষ্টি

এটি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য একটি নতুন মাইলফলক

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান (মিনারেল কনসেন্ট্রেট) তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। যা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্টও অর্জন করেছে। এ উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির মোট উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সংখ্যা ২১টি তে পৌঁছালো। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের খাদ্য বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক এবং স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন যৌথ গবেষণার মাধ্যমে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

গাকৃবির ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং গবেষকদ্বয়ের দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ প্রযুক্তিটি উদ্ভাবিত হয়। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নাম পরিবর্তনের পর এটিই প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষণাটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের “গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন”(জিএআরই) প্রজেক্ট।

যে কাঁঠালের বীজ এতোদিন রান্নাঘর, বাজার কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অবহেলিত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, সেই বীজই এখন দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, খাদ্যশিল্প এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর বীজ, খোসা ও অন্যান্য অংশের বড় একটি অংশ বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই বীজেই রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা খনিজ ও পুষ্টি উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো কাঁঠালের বীজে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান থাকলেও উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশেরও বেশি ঘনীভূত খনিজ উপাদান বা মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যায়। পরবর্তীতে এ উদ্ভাবনী গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) থেকে পেটেন্ট লাভ করে।

মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখতে খনিজ উপাদানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ উপাদানের ঘাটতি এখনও দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর পুষ্টি সমস্যার অন্যতম কারণ।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষক খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রখ্যাত খাদ্য বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. এমদাদুল হক এবং স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন বলেন, “কাঁঠালের বীজ থেকে প্রাপ্ত এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ উদ্ভাবনের ফলে অবহেলিত ও অপচয় হওয়া কাঁঠালের বীজ একটি উচ্চমূল্য সংযোজিত খাদ্য উপাদানে পরিণত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি খাদ্য অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষিজ বর্জ্যরে কার্যকর ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তির অন্যতম উদ্ভাবক প্রফেসর ড. এমদাদুল হক বলেন, ‘‘কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।’’ 

গাকৃবিতে এ যাবৎ ৯৭টি উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জনের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য একটি নতুন মাইলফলক। আমাদের গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, কৃষিজ বর্জ্য হিসেবে পরিচিত একটি উপাদানকে কীভাবে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তর করা যায়।

তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য, গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখা।”

   

About

Popular Links

x