ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের ‘এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’-এর ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্রাম্যমাণ সিলিন্ডার লরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাথমিক অনুসন্ধান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এছাড়াও ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তাদের অনুসন্ধানে আগুনের সূত্রপাত ও দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আনসার সদস্য, শ্রমিক ও পথচারীসহ ৪০ জনের বেশি মানুষ।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, কারখানা প্রাঙ্গণে দেয়ালের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা লরিগুলোর একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এসব লরির মধ্যে ৪ নম্বর লরিতে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, কারখানাটিতে তিতাসের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার লরি থেকে গ্যাস ব্যবহার করা হতো। তবে এসব লরিতে ব্যবহৃত সিলিন্ডারগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত চাপ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ৪ নম্বর লরিতে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কাভার্ড ভ্যানের ওপরের অংশ ও সিলিন্ডারের খণ্ডাংশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একটি অংশ ছিটকে পাশের ১০ তলা ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। সিলিন্ডারের মূল সরবরাহ লাইনেও আগুন ধরে যায়।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে জিরাবো ও ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে আটটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়।
ঘটনাস্থলে লরির ভেতর থেকে ৫ জনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। বিস্ফোরণের পর সিলিন্ডারের ছিটকে আসা অংশের আঘাতে রাস্তার পথচারী মোছাম্মত জয়নব বেগম (৫৫) ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুলবুল নামের আরও একজন মারা যান। এতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ জনে।
এ দুর্ঘটনায় প্রীতি গ্রুপের কারখানা প্রাঙ্গণে থাকা প্রায় ৮ থেকে ৯টি লরি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন আনসার সদস্য, শ্রমিক ও পথচারীসহ ৪০ জনের বেশি মানুষ।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
ঘটনাটি তদন্তে বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। কমিটিতে সহকারী পরিচালককে সভাপতি, কমান্ডারকে সদস্যসচিব এবং সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তা ও ইন্সপেক্টরকে সদস্য করা হয়েছে।
জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিকভাবে সাত থেকে আটটি কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে প্রচুর গ্যাস সিলিন্ডার দেখতে পান তারা। সিলিন্ডারগুলো থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়ছিল। আগুন যাতে আশপাশে ছড়িয়ে না পড়ে, বিশেষ করে পাশের এফএনএফ গার্মেন্টসের ভবনে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে তারা কাজ শুরু করেন। পরে ইপিজেড ফায়ার স্টেশন থেকে আরও দুটি ইউনিট যোগ দেয়। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকলেও সফলভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
তিনি আরও বলেন, ‘‘ঘটনাস্থলে অনেকগুলো গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার থাকায় ঝুঁকির মাত্রা বেশি ছিল। একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত। বিশেষ করে কোনো সিলিন্ডার ভবনের ভেতরে বিস্ফোরিত হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারত।’’
কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি জানান, সিএনজির বিকল্প হিসেবে এভাবে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের কোনো বিধান আছে বলে তার জানা নেই। বিষয়টি তাদের দেখভালের আওতার মধ্যে রয়েছে। কাভার্ড ভ্যানের ভেতরে এভাবে সিলিন্ডার রেখে ব্যবহার করাটা কিছুটা আড়ালে করা হয় বলে মনে করেন তিনি।
নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে।



