ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম চললেও ১১ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বসিয়ে রেখেও পূর্ণ বেতন দিতে হচ্ছে মালিকদের। ফলে লোকসানে পড়ছেন তারা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্লাস্টিক কারখানাগুলো।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) গোপালগঞ্জ শহর বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ শহরের বিসিক ফিডারে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা দুই মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১-১.২৫ মেগাওয়াট।
গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর শিল্পনগরী কর্মকর্তা সুজন দাস জানান, ১৯৮৭ সালে শহরসংলগ্ন ঘোষেরচর এলাকায় সরকার বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য ১০.৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পরে মাটি ভরাট করে ভূমি উন্নয়ন করা হয়। ১৯৯৫ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিসিক শিল্পনগরীর কার্যক্রম শুরু হয়।
তিনি আরও জানান, বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ৭৪টি শিল্প প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি প্লটে শিল্প ইউনিট চালু আছে। এসব ইউনিটে কাঠ ও স্টিলের ফার্নিচার, ডাল, অটোমোবাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, পলিমার, তেল, মুড়ি ও স্যানিটারি সামগ্রী উৎপাদন করা হয়।
সুজন দাস বলেন, “ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এসব শিল্পের উৎপাদন কমে গেছে। ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সময় শ্রমিকদের কাজ না থাকলেও তাদের হাজিরার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে শিল্পমালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিসিক শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ শুরু করা হয়েছে।”
খান ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক কাজী হাসান বলেন, “বিসিক শিল্পনগরীতে তাদের প্লাস্টিকসংশ্লিষ্ট তিনটি শিল্প ইউনিট রয়েছে। একটি মেশিন চালু হওয়ার পর গরম হতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় মেশিনের তাপমাত্রা শূন্যে নেমে যায়। এতে মেশিনের ভেতরের কাঁচামাল নষ্ট হয় এবং শ্রমিকদেরও বসে থাকতে হয়।”
তিনি বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের একটি মেশিনের স্ক্রু নষ্ট হয়ে গেছে, যার দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এটি চীন থেকে আনাতে হবে এবং সময় লাগবে প্রায় ১৫ দিন। ফলে ওই ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।”
গোপালগঞ্জ বিসিকের শরীফ ফার্নিচারের পরিচালক ইমাম হাসান সুনসি বলেন, “বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে তাদের যন্ত্রপাতির প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা কারখানায় কাজ হলেও এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এ সময় শ্রমিকেরা বসে থাকেন, কিন্তু তাদের বেতন দিতে হয়। এতে উৎপাদন প্রায় ৪৫%-এ নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, “উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং শোরুমে ফার্নিচারের সরবরাহও আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।”
দিনের বেলায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। রাতে লোডশেডিং করা হলে শিল্পকারখানায় তেমন সমস্যা হবে না বলেও জানান তিনি।
মণি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী বিধান বিশ্বাস বলেন, “ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে ধান মাড়াইকল ও কৃষিযন্ত্রপাতি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনে তাদের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে এ সময়ে লোকসান হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।”
লুৎফর রহমান ডাল মিলের স্বত্বাধিকারী লুৎফর রহমান লুথু বলেন, “বিদ্যুৎ সংকটে ডালের উৎপাদন কমে গেছে। শ্রমিকদের বসিয়ে রেখেও পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। ফলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডাল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং মিলটি লোকসানে চলছে।”
গোপালগঞ্জ মোটরসের মালিক মো. ইকবাল হোসেন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে গাড়ি সার্ভিসিংয়ের কাজ হয়, যেখানে সব সময় বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিছু কাজ ম্যানুয়ালি করা সম্ভব হলেও বিদ্যুৎ ছাড়া বিসিকের প্রায় সব কার্যক্রমই অচল হয়ে পড়ে। কারণ সেখানে গ্যাসের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ওজোপাডিকোর গোপালগঞ্জ শহর বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “শহরের নয়টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব ফিডারে মোট চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে আট থেকে নয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সরবরাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি ফিডারেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বিসিক ফিডারে বিদ্যুতের চাহিদা দুই মেগাওয়াট।”
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ফলে দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারপরও বিসিক ফিডারের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।



