আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘিরে সোনাগাজীতে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছর পর উচ্চ আদালতের রায় ঘিরে নুসরাতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া।
সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্টে এ রায় ঘোষণা করা হবে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ন্যায়বিচারের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নুসরাতের পরিবার। শুনানি শেষে ২৪ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। তার প্রত্যাশা, নিম্ন আদালতের দেওয়া দৃষ্টান্তমূলক সাজা উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের এই পর্যায়ে আদালতের প্রতি পরিবারের আস্থা রয়েছে। তবে মেয়ের ন্যায়বিচারের পাশাপাশি বেঁচে থাকা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন শিরিন আক্তার। অতীতে হুমকি-ধমকির কারণে পরিবারের মধ্যে এখনো ভয় কাজ করে। অপরাধীদের সহযোগীরা প্রতিশোধ নিতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে স্থায়ী নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়েছে।
রায় ঘিরে সোনাগাজীতে নানা প্রতিক্রিয়া
নুসরাত হত্যা মামলার রায় কী হয়, তা নিয়ে সোনাগাজীর মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকের কাছে নুসরাত হত্যাকাণ্ড এখনো গভীর বেদনার স্মৃতি। ঘটনার পর সোনাগাজী দীর্ঘদিন দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় ছিল।
স্থানীয় শিক্ষক আবদুর রহিম বলেন, “আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে ন্যায়সংগত রায় দেবেন—এটাই প্রত্যাশা।” তাঁর মতে, এ মামলার বিচার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল আলম বলেন, “নুসরাত হত্যার কথা সোনাগাজীর মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি। রায় কী হয়, সেদিকে সবার নজর রয়েছে। আমরা চাই আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার হোক।”
নুসরাত যে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানকেও ঘিরে ঘটনার পর নানা আলোচনা ও সমালোচনা হয়। মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের কাছেও মামলার রায় গুরুত্বপূর্ণ।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মাওলানা সামছুল করিম বলেন, “নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের জন্যও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ঘটনাটি থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।”
টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি
গত ২৮ জুলাই থেকে এই হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা মোট ১৭ কার্যদিবস শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে চূড়ান্ত শুনানি পরিচালনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন। পরে বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়।
১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট হাইকোর্ট ২৪ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করেন।
ডেথ রেফারেন্সের অর্থ হলো, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। আজকের রায়ে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি না, তা নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ফলও জানা যাবে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন নুসরাতের মা শিরীন আক্তার। পরে সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় হত্যা মামলা করেন। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই মামলার বিচার শেষে নিম্ন আদালত ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হলেন, এস এম সিরাজ উদদৌলা, রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।
দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার পর আজ উচ্চ আদালতে মামলাটির রায় ঘোষণা হবে। রায়কে ঘিরে নুসরাতের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে। সোনাগাজীর মানুষেরও নজর এখন উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে।



