একদিকে মাঠে ফলানো আলুর ন্যায্য দাম মিলছে না, অন্যদিকে হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, সার-বীজ ও কীটনাশকের ব্যয় মিটিয়েও যখন কৃষক বাজারে আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না, তখন অতিরিক্ত হিমাগার ভাড়া তাদের লোকসানের বোঝা আরও ভারী করে তুলছে। কৃষকদের ভাষায়, আলু ফলিয়ে এখন লাভের হিসাব নয়, বরং কতটা লোকসান কমানো যায়—সেই চিন্তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণে জেলা সুপারিশ কমিটির সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন রাজশাহীর কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, বস্তার নিট ওজন থেকে ৫ কেজি বাদ দিয়ে প্রতি কেজি আলুর সর্বোচ্চ সংরক্ষণ ভাড়া ৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ কার্যকর করতে হবে। এ সুপারিশের বাইরে একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বৃহত্তর কর্মসূচি ও প্রয়োজনে আইনগত লড়াইয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বেলা ১১টায় রাজশাহীর পবা উপজেলার তকিপুরে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ের সামনে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ, সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান মিলন, সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি ও সংগঠনের সদস্য মিঠু হাজী বক্তব্য দেন। এ সময় সংগঠনের অন্যান্য নেতা এবং আলুচাষিরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জেলা সুপারিশ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বস্তার নিট ওজন থেকে ৫ কেজি বাদ দিয়ে প্রতি কেজি আলুর জন্য সর্বোচ্চ ৫ টাকা হিমাগার ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এ সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ব্যত্যয় তারা মেনে নেবেন না।
সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ জানান, প্রায় দুই বছর ধরে তারা হিমাগারে আলু সংরক্ষণের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের লক্ষ্যে পৃথক সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন জেলার সুপারিশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে জমা হয়েছে।
তিনি বলেন, “জেলা সুপারিশ কমিটির সুপারিশের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত এলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনগত লড়াই চালানো হবে। হিমাগার মালিকেরা উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিলে কৃষকরাও তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় উচ্চ আদালতে যাব।”
সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি অভিযোগ করেন, উত্তরাঞ্চলে দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদিত হলেও হিমাগার মালিকেরা যোগসাজশ করে সংরক্ষণ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। চলতি মৌসুমে আলু উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে বাজারে আলুর দাম কম থাকায় এবং হিমাগার ভাড়া বাড়ায় কৃষকের লোকসান আরও বেড়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঐক্যবদ্ধভাবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সমিতির সহ-সভাপতি আলু চাষি মিজানুর রহমান মিলন বলেন, “স্টোর ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। আমরা চাই যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হোক। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”
সমিতির সদস্য আলুচাষি মিঠু হাজী জানান, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও ভোক্তার ওপর। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে কোনো সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন না।



