Monday, August 31, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পরিচয় যাচাই ছাড়াই বাসা ভাড়া, অপরাধীদের আশ্রয় নিয়ে শঙ্কা সাভারে

গত এক বছরে সাভার-আশুলিয়ায় ১৫টির বেশি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

ঢাকার সাভার আশুলিয়ায় ভাড়াটিয়ার পরিচয় যাচাই ছাড়াই বাসা ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখেন না, সংরক্ষণ করেন না ভাড়াটিয়ার পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা কিংবা মুঠোফোন নম্বরও।

ফলে কোন বাসায় কারা থাকছেন, তাদের সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই কোনো তথ্য থাকছে না। জনবহুল এই শিল্পাঞ্চলে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণের এই দুর্বলতা অপরাধীদের আত্মগোপনের সুযোগ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, সাভার-আশুলিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ার সঠিক হালনাগাদ তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই, অথচ প্রায় ৪০ লাখ মানুষের বসবাস এই শিল্পাঞ্চলে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো শ্রমজীবী মানুষের কারণে এখানকার বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, যার সুযোগে পরিচয় গোপন করা সহজ হয়ে উঠছে অপরাধীদের জন্য।

এর প্রভাব পড়ছে অপরাধ তদন্তেও। গত এক বছরে সাভার-আশুলিয়ায় ১৫টির বেশি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, যাদের অধিকাংশের পরিচয় শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।

আশুলিয়ার জামগড়ায় সম্প্রতি এক অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এই সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জানা যায়, দুই দিন আগে বাসাটি ভাড়া নেওয়া হলেও বাড়িওয়ালার কাছে ভাড়াটিয়াদের কোনো পরিচয়পত্র বা মোবাইল নম্বর ছিল না। আশুলিয়া থানার এসআই রাশেদুজ্জামান জানান, একটি ফোন নম্বর থাকলেও দ্রুত পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হতো, কিন্তু তথ্যের অভাবে তদন্তে বিলম্ব হয়েছে এবং অপরাধীরা পালানোর বাড়তি সুযোগ পেয়েছে। পরে পরিচয় শনাক্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সহায়তা নিতে হয়।

একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে সাভার-আশুলিয়ায় আরও কয়েকটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় যার মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের আলোচিত রোকসানা আক্তার হত্যাকাণ্ড এবং সম্প্রতি আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া অর্ধগলিত মরদেহের ঘটনা, যেখানে পরিচয় নিশ্চিত করতেই পুলিশের সাত ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।

মূলত পোশাকশিল্পকেন্দ্রিক এই এলাকায় কর্মস্থলে শ্রমিকদের তথ্য থাকলেও বসবাসের স্থানে তেমন কোনো তথ্যভান্ডার নেই। বিশেষত ব্যাচেলরদের বাসাগুলোতে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণ খুবই সীমিত কোথাও শুধু নাম-নম্বর, আবার কোথাও নিছক মৌখিক পরিচয়ের ভিত্তিতেই বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় ঝামেলা এড়াতে অনেক বাড়িওয়ালা পরিচয়পত্র বা তথ্য ফরম রাখেন না।

দীর্ঘদিনের ভাড়াটিয়া আমিনুল ইসলাম জানান, সাত বছর ধরে একই এলাকায় থাকলেও কোনো বাড়িওয়ালা তার পরিচয়পত্র চাননি, শুধু অগ্রিম টাকা আর মৌখিক পরিচয়েই রুম মিলেছে। তবে বাড়িওয়ালা শিরীন আক্তার বলেন, এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে বাসা দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

শুধু অজ্ঞাত মরদেহ নয়, বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদেরও এই এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার নজির রয়েছে মানিকগঞ্জের টুটুল হত্যা মামলার আসামি, ফরিদপুরের অটোরিকশাচালক হত্যা মামলার আসামি এবং শেরপুরের এক মামলার আসামিকে সম্প্রতি আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি ভুয়া পরিচয়ে সাভারের শ্যামপুরে বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গি আস্তানা তৈরির ঘটনাও ঘটেছে অতীতে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতা এমন ঘটনা প্রতিরোধ কঠিন করে তুলছে, আর অপরাধী উগ্রবাদীরা এই সুযোগে এলাকায় মিশে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, বাড়িওয়ালাদের তথ্যও ব্যবসায়ীদের মতো ইউনিয়ন পরিষদ বা থানায় বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত থাকা উচিত। হোল্ডিং নম্বর ধরে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে অপরাধ অনেকাংশে কমবে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান জানান, পুরো ঢাকা জেলাজুড়ে ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালার তথ্য সংরক্ষণে একটি সেলফ-রেজিস্ট্রেশনভিত্তিক অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব হলেও নিরাপত্তার তাগিদে পুলিশ নিজেরাই উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে।

পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মুরশেদ জানান, অজ্ঞাতনামা মরদেহের পরিচয় শনাক্তে পিবিআই নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও ভাড়াটিয়া ফরম বা বায়োডাটা থাকলে তদন্ত অনেক দ্রুত এগোয় সঠিক তথ্য সংরক্ষিত থাকলে অপরাধ রহস্য উদঘাটন আসামি শনাক্তকরণ সহজ হয়।

   

About

Popular Links

x