বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে গিয়ে নিজেদের সমকামী দাবি করে স্থায়ী আশ্রয়ের আবেদন করা কয়েকজনকে সহায়তার অভিযোগে একটি চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে সাজানো ছবি ও জাল নথিসহ মনগড়া প্রমাণ তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে অভিবাসীদের কাছ থেকে সাড়ে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা কয়েক ডজন বাংলাদেশি পুরুষের আশ্রয় আবেদনে সহায়তা করেছেন। ওই পুরুষেরা দাবি করেছিলেন, দেশে ফিরলে তাদের প্রাণনাশের শঙ্কা আছে।
বিবিসি জানায়, মঙ্গলবার লন্ডনের বিভিন্ন ঠিকানা থেকে জালিয়াতি ও অভিবাসন-সংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে প্রথমে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ফোন, অলংকার এবং হাজার হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়। অভিযোগ আছে, চক্রটি আবেদনকারীদের সমকামী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভুয়া আশ্রয়ের প্রমাণ তৈরিতে সহায়তা করত। একই দিন পরে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে থাকার সন্দেহে তৃতীয় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার জানান, এই গ্রেপ্তার পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলভিত্তিক “আপনজন” নামের একটি বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ভুয়া আবেদনের ভিত্তিতে হয়েছে। আশ্রয় আবেদন পর্যালোচনাকারী কর্মকর্তারা কিছু সন্দেহজনক আবেদনে একই ধরনের মিল দেখতে পান। এরপর কয়েক মাস ধরে তদন্ত চলে।
ফস্টারের ভাষ্য, “গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ওই চক্র এক হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফির বিনিময়ে ভুয়া চিঠি ও নথি দিত। এর মধ্যে ছিল ‘আপনজন’ এর প্যাডে সমর্থনসূচক চিঠি, আবেদনকারীদের সমকামী প্রমাণের জন্য সাজানো ছবি এবং বন্ধুত্ব বা সমকামী সম্পর্কের দাবি করা ব্যক্তিদের সই করা মিথ্যা চিঠি। চক্রটির সঙ্গে যুক্ত শতাধিক আশ্রয় আবেদন এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করছে।“
ফস্টার বলেন, “কিছু ভুয়া আবেদন নিঃসন্দেহে মঞ্জুর হয়ে যেত। তবে অভিবাসন বিচারকেরা এর আগে এই গোষ্ঠীর দেওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণকে অবিশ্বস্ত বলে সমালোচনা করেছেন। এক আবেদনকারী গোষ্ঠীটির অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার দাবিতে সাজানো ছবি জমা দিয়েছিলেন বলেও বিচারকেরা দেখেছেন।“
স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানায়, রাজনৈতিক কারণে প্রাথমিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সমকামিতার ভিত্তিতে নতুন করে আবেদন করা পুরুষদের জন্য এই গোষ্ঠী প্রায়ই সুপারিশ করত। এক ক্ষেত্রে একজন আবেদনকারী মূল আবেদনের নয় বছর পর পর্যন্ত নিজের যৌন পরিচয় প্রকাশ করেননি।
চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, যুক্তরাজ্যের কয়েকটি আইনি প্রতিষ্ঠান ও উপদেষ্টা অভিবাসীদের আশ্রয় পেতে সমকামী হওয়ার ভান করতে সাহায্য করছিলেন। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা একই কৌশল ব্যবহার করছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত আশ্রয় আবেদনগুলোর পর্যালোচনা চলছে। এর ভিত্তিতে গত মে মাসে দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
এপ্রিলে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তানিসা খান নামের এক উপদেষ্টা ছদ্মবেশী সাংবাদিককে বলেছিলেন, তিনি গে ক্লাবের ছবি ও অন্যান্য সহায়ক প্রমাণসহ একটি “বিস্তারিত প্যাকেজ” দিতে পারবেন। তিনি “উস্টার এলজিবিটি” নামের একটি সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রমাণ জোরালো করতে ওই গোষ্ঠীতে যোগ দিতে বলেছিলেন।
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে গোষ্ঠীটির এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুরুষদের কয়েকজন দাবি করেন, তারা কেউই সমকামী নন। তদন্তে আরও জানা যায়, আশ্রয়ের আবেদন জোরালো করতে ভুয়া স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য ও ভুয়া খবরের ওয়েবসাইটও ব্যবহার করা হচ্ছিল। জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার পর “উস্টার এলজিবিটি” গ্রুপটি বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, “যারা নিপীড়নের ভান করেন, তারা ঘৃণারও অযোগ্য। এতে প্রকৃত সুরক্ষাপ্রার্থীদের উপহাস করা হচ্ছে।“ এই জালিয়াতি থেকে লাভবান চক্রগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, “তাদের বিচার হবে, অবৈধ অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যারা প্রতারণা করবেন, তাদের আবেদন খারিজ করে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।“
বিবিসি জানায়, আশ্রয় জালিয়াতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।



