Friday, October 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পদ্মার ভাঙনে বদলে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানচিত্র

বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২০ এএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বদলে যাচ্ছে জেলার নদীতীরবর্তী এলাকার চেনা চিত্র। একের পর এক বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এবারের বন্যার পর সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, নামোজগন্নাথপুর, ফিল্ডেরহাট, কানছিরা, বোগলাউড়ি ও ঝাইলপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা।

ভাঙনের আতঙ্কে মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলেই রাতবিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরবাড়ি সরাতে ছুটে আসছেন স্থানীয়রা। গত চার-পাঁচ বছরে নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবারকে আট থেকে ১০ বার পর্যন্ত বসতভিটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। জমিজমা হারিয়ে অনেকে এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল বলেন, “নদীভাঙনে চার ইউনিয়নের চেনা মানচিত্রই বদলে গেছে। পাঁকা ইউনিয়নের নিশিপাড়া, দক্ষিণ পাঁকা, ২০ রশিয়া, জ্যাকপাড়া ও দোভাগী এবং আশপাশের মনোহরপুর ও ফিল্ডেরহাট এলাকায় গত ১০ দিন ধরে ব্যাপক ভাঙন চলছে।

তার দাবি, পাঁকা ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৫০০ পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে এসব পরিবারের অনেকেই অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ফিল্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম, মোশাররফ হোসেন ও সাদিকুল ইসলাম জানান, দুলাল, রোজবুল, মান্নান, রফিক, সালাম, জিয়াউল ও বাবরসহ অসংখ্য মানুষের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নদীভাঙনে শুধু বসতভিটাই নয়, বিপুল পরিমাণ আবাদি জমিও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে, নদীতীরবর্তী এলাকায় কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও ভাঙনের ফলে জমি কেটে তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচর।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল জানান, পানি সরে যাওয়ার পর প্রায় ৪ হাজার একর জমিতে গম, সরিষা ও ভুট্টার আবাদ করা জরুরি। তবে বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। তাই সরকারি উদ্যোগে বিনা মূল্যে অথবা সহায়তামূল্যে কৃষকদের বীজ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার গতিপথ ও প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। তাদের দাবি, বর্ষায় ফারাক্কার গেট খোলার পর নদীর প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। তবে ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় নদীভাঙনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা কারিগরি ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়নের বিষয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান মিশু জানান, নদীতীর সংরক্ষণে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ ও সংরক্ষণকাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ১৬টি বামতীর ও সাতটি ডানতীরের বাঁধ রক্ষার কাজ রয়েছে। বামতীরের প্রকল্পগুলোতে ১ হাজার ৯৪০ মিটার এবং ডানতীরের প্রকল্পগুলোতে ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষার কাজ করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী জানান, চলতি বছর শিবগঞ্জের দুর্লভপুরের মনোহরপুর, আইয়ুব বিশ্বাসের টোলা, নামোজগন্নাথপুর, ডাইলপাড়া, পাঁকার কানছিরা এবং সদর উপজেলার নারায়ণপুর চর, আলাতুলি, দেবীনগর ও হড়মা এলাকায় ভাঙন চলছে। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, স্কুল, মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হবে এবং বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানো মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তাদের দাবি, চলমান প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর সংরক্ষণকাজ শুরু করা হোক।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এর আগে সুন্দরপুর ইউনিয়ন থেকে আলাতুলি ইউনিয়ন পর্যন্ত পদ্মার বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে নতুন করে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেসব জায়গায় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

   

About

Popular Links

x