রেকর্ডের আশায় নেত্রকোনার ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য ৭০ বছর বয়সে ২৮১ কিলোমিটার সাঁতার কেটে সবেচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রমের গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড নিজের দখলে নিতে চেয়েছিলেন।
সেই লক্ষ্যে সোমবার (২৯ আগস্ট) সকাল থেকে সাঁতারও শুরু করেছিলেন তিনি।
কিন্তু বিধিবাম! শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ক্ষিতীন্দ্রকে বিশ্বরেকর্ডের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে মাত্র ৮৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সুনামগঞ্জের হরিনাপাটিতে পৌঁছে চিকিৎসকের পরামর্শে একুশে পদকজয়ী এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সাঁতার শেষ করতে হয়েছে।
অনলাইন সংবাদমাদ্যম বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার (সাবেক) বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বলেন, ক্ষীতিন্দ্র মঙ্গলবার দুপুরের দিকে দুর্বল হয়ে পড়েন। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এই অবস্থায় সঙ্গে থাকা চিকিৎসক তাকে পানি থেকে উঠে আসার পরামর্শ দেন। প্রথমে রাজি না হলেও সবার অনুরোধে তিনি শেষ পর্যন্ত পানি থেকে উঠে আসতে রাজি হন।
২০২১ সালের ১৯-২০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় টানা ২৫০ কিলোমিটার সাঁতরে ম্যারাথন সাঁতারের ১৫ বছরের পুরোনো রেকর্ডটিকে ভেঙে নিজের করে নেন স্প্যানিশ সাঁতারু পাবলো ফার্নান্দেজ।
আরও পড়ুন- ৭০-এ এসে সাঁতরে গিনেস রেকর্ড গড়তে চান নেত্রকোনার ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র
সেই বিশ্বরেকর্ড ভাঙতেই সোমবার সকাল সাড়ে ৬টায় সিলেট নগরীর সুরমা কিনব্রিজ পয়েন্ট সংলগ্ন চাঁদনিঘাট থেকে সাঁতার শুরু করেছিলেন ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। একুশে পদকজয়ী এই মুক্তিযোদ্ধার ২৮১ কিলোমিটার সাঁতরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ফেরিঘাটে পৌঁছানোর কথা ছিল। এ যাত্রায় ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ- এই চার জেলা আংশিক বা সম্পূর্ণ অতিক্রম করবেন। এতে প্রায় ৭০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর বাড়ি নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে। ১৯৫২ সালের ২৩ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সিলেটের এমসি কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি চাকরিজীবনে প্রবেশ করেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালের মে মাসে অবসর নিলেও এখনও পরামর্শক (কনসালটেন্ট) হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অধীনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কাজ করছেন।
ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।
সাঁতারু হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, “ছাত্রজীবন থেকেই সাঁতার আমার নেশা। আমি একজন অবিরাম শৌখিন সাঁতারু। ১৯৭০ সাল থেকেই আমি দূরপাল্লার বা অবিরাম সাঁতারের সঙ্গে জড়িত। সেবার নিজের এলাকা নেত্রকোনার মদনে টানা ১৫ ঘণ্টা সাঁতার কেটেছিলাম। তারপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধে যাই।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৭৩ সালে সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে টানা ৮২ ঘণ্টা সাঁতার কেটেছিলাম। এ ছাড়া সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন পুকুর, ধোপাদিঘী, সুনামগঞ্জ এবং ছাতকেও দীর্ঘ সময় অবিরাম সাঁতার কেটেছি। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটানা ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট এবং ১৯৭৬ সালে ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে জাতীয় রেকর্ড করি। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটানা ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট সাঁতার কেটে জাতীয় রেকর্ড করায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে রুপার নৌকা দিয়ে সম্মানিত করেন। ২০১৮ সালে ১৮৫ কিলোমিটার দূরপাল্লার সাঁতার কাটি, যা ছিল আরেকটি স্থানীয় রেকর্ড।”



