“কোম্পানি আইন-১৯৯৪” এর “আমূল পরিবর্তন” করে একটি নতুন আইন তৈরির জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, “প্রচলিত আইনটি যুগোপোযোগী না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর নয়, ফলে বাংলাদেশের উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনটি বড় বাধা।”
একইসঙ্গে, প্রাইভেট ও পাবলিক কোম্পানির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধসহ সকল ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে ১৪ পরামর্শ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
টপ টেন ফেবিক্স অ্যান্ড টেইলার্স লিমিটেডের মালিকানার স্বত্ব সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
বুধবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৩২ পৃষ্ঠার এই রায় প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, “বর্তমান কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োগের অনুপযোগী। কোম্পানি আইন-১৯৯৪ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি পুরোটাই কোম্পানি আইন ১৯১৩ রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিতে হলে অবশ্যই দ্রুত ১০৯ বছরের পুরোনো কোম্পানি আইন আমূল পরিবর্তন একান্তভাবে অপরিহার্য।”
আদালত বলেন, “প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে কয়েক লাখ প্রাইভেট ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য একটি মাত্র কোম্পানি আদালত। অসংখ্য কোম্পানি বিরোধের জন্য একটি কোম্পানি বেঞ্চ থাকার কারণে কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারলে কোম্পানিগুলো উন্নত হয়ে দেশকেও উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারবে। আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের আদলে আমাদের কোম্পানি আইনকে ঢেলে না সাজালে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যাবে।”
রায়ে হাইকোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ১৪টি পরামর্শ দেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুততার সঙ্গে ভারতের কোম্পানি আইনের আদলে বাংলাদেশের কোম্পানি আইন সংশোধন করে নতুন কোম্পানি আইন প্রণয়ন; প্রতি বছর ওই আইন হালনাগাদ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; প্রতিটি জেলায় কোম্পানির সংখ্যানুপাতে এক বা একাধিক কোম্পানি আইনের ট্রাইব্যুনাল গঠনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; প্রতিটি বিভাগে একটি করে কোম্পানি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাণিজ্যমন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে রায়ের অনুলিপি দ্রুত পাঠাতে বলেছেন হাইকোর্ট।
কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোম্পানি গঠন, পরিচালনা এবং কোনো ধরনের বিরোধ তৈরি হলে সেটি প্রতিকারের পথ বাতলিয়ে দেয় কোম্পানি আইন। কিন্তু আইনটা যুগোপোযোগী না হওয়ায়, এই আইনের অনেক কিছুই বাস্তবায়ন সহজ নয়। এছাড়া আইনে অনেক বিষয় অস্পষ্ট থাকায় সেটির কারণে আদালতে প্রচুর পরিমাণ মামলা হচ্ছে। যেগুলো নিষ্পত্তিতে লাগছে দীর্ঘ সময়।
কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট প্রবীর নেওগী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানি আইনের সঙ্গে আমাদের আইনের অনেক ব্যবধান রয়েছে। ফলে ওসব দেশের আইন-আদালত ব্যবসাবান্ধব হওয়ায় তারা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।”
তিনি আরও বলেন, “কোম্পানি নিবন্ধনের পর সেটি রেগুলেটিং করার জন্য যথাযথ বিধান নেই। বিদেশে কোম্পানি ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর) বাধ্যতামূলক হলেও তা বাংলাদেশে নেই।”
অ্যাডভোকেট প্রবীর বলেন, “একটি কোম্পানির পরিচালকদের মধ্যে মতের অমিল হলে, সেটির সমাধান কিভাবে সম্ভব সেটির বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। এ রকম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এছাড়া, কোম্পানির এজিএম কোথায় হবে, এটি নিয়ে আইনে স্পষ্ট বিধান নেই। কোম্পানি আইনে এ রকম অর্ধশতাধিক সমস্যা আছে। যেগুলোর কারণে দেশে অনেক কোম্পানি থাকলেও তাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন।”



