Tuesday, October 20, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অন্যের বোঝা বয়ে বেড়ানো শিশুদের জীবনসংগ্রাম

বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ লাখ শিশু বিভিন্ন সেক্টরে শিশুশ্রমে যুক্ত। দেশের প্রায় ১৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। এই শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৩, ০২:২৬ পিএম

দেশের আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বহু দরিদ্র পরিবারের শিশুকে জীবিকার জন্য কাজে নামতে হয়। বাস-লেগুনায় চালকের সহকারী, দোকান কর্মচারী, ফুল কিংবা চা বিক্রেতার মতো পেশায় শিশুদের সচরাচর দেখা যায়। তবে এমনও কিছু পেশা আছে যেগুলো অতটা পরিচিত নয়, সচরাচর চোখেও পড়ে না। তেমনই এক পেশা মুটে। কোনো কোনো এলাকার হাট-বাজারে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিত্তবানদের বাজার বয়ে নেওয়া অর্থাৎ মুটের কাজটি করে থাকে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণ বড় একটি চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৪৯ লাখ শিশু বিভিন্ন সেক্টরে শিশুশ্রমে যুক্ত।

রাজধানী ঢাকার কচুক্ষেত এলাকায় এমন কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কথা হয় ঢাকা ট্রিবিউনের। তাদের এই পেশায় আসা, কাজের ধরন, আয় এসব বিষয় জানার চেষ্টা করেছেন প্রতিবেদক।

এমনই একজন ১২ বছর বয়সী মোশাররফ। তার সরল জিজ্ঞাসা ছিল, “এক দিন কাজ না করলে আমার ৫০০ টাকা লোকসান। তাই যত কষ্টই হোক, প্রতিদিন কাজ করতেই হয়।”

১০ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার পর শুরু হয় নতুন জীবন সংগ্রাম। রিকশাচালক বাবার একার আয়ে সংসার চলে না। তাই ঢাকায় আসার পর পর মোশাররফও নেমে পড়ে কাজের সন্ধানে। ছুটে বেড়ানোর বয়সে একদিন বাবার হাত ধরেই তার মুটে বওয়ার কাজ শুরু। এখন এটিই তার পেশা।

মোশাররফরা থাকে ইব্রাহিমপুর এলাকায়। ছয় ভাই-বোনের মাঝে সে তৃতীয়। দুই বছর ধরে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই দফায় বাজারে কাজ করে সে। এই শিশুরা মূলত ক্রেতাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তাদের সদাই বহন করে। তাদের কাজের ধরাবাঁধা মজুরি নেই। কেউ ২০ টাকা দেয়, আবার কেউ কেউ খুশি হয়ে ১০০ টাকাও দেয় কখনো কখনো।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা ইউনিসেফের এক জরিপে জানানো হয়, বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকদের গড় দৈনিক আয় ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কাজের ধরনের ওপর তাদের মজুরির তারতম্য ঘটে।

মোশাররফের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এই আয়ে সে খুশি। খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই এই কিশোরের। তবে কাজের পাশাপাশি সে পড়াশোনায় কিছুটা আগ্রহী। প্রতিদিন দুপুরে তার মতো আরও অনেক শিশু শ্রমিক কচুক্ষেত এলাকার একটি ভ্রাম্যমাণ স্কুলে পড়তে যায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ দুপুরের খাবার দেয় তাদের। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে কিছুক্ষণের বিশ্রাম। বিকেলে ফের মুটে বইতে বাজারে ছোটা।

সে জানায়, সকালে এবং সন্ধ্যার পর থেকে কাজের চাপ বেশি হয়। সারাদিন এই কাজে কষ্ট হয় কি-না জানতে চাইলে মোশাররফের উত্তর, “কষ্ট হলেও কিছু করার নেই, এখন এটাই আমার করতে হবে।”

এই কিশোর তার বাবাকে সাহায্য করতে চায়। সেজন্য আরও কষ্ট করতে হলেও দুঃখ নেই।

একই গল্প ১৪ বছর বয়সী নোমানেরও। প্রায় আট বছর ধরে সে করছে মুটে বওয়ার কাজ। নোমানের বাবাও পেশায় রিকশাচালক এবং মা গৃহকর্মীর কাজ করেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে নোমানও চায় সংসারের হাল ধরতে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দিনের বড় অংশ কচুক্ষেত বাজারেই কেটে যায় নোমানের।

নোমান-মোশাররফদের ব্যস্ততা অনেক। খুব বেশি কথা বলার সময় নেই। কথা বলতে বলতে কাজ ছুটে গেলে লোকসান! কবির সুমন গেয়েছিলেন-“এ কিশোর পারবে কি এই বোঝা টানতে?/ এই বাবু কোনো দিন পারবে কি জানতে?”

বাজারে আসা ক্রেতারা এসব শিশু শ্রমিককে টাকা দিয়ে চলে যান। মাথা থেকে বোঝা নামে, ফের ওঠে নতুন বোঝার ভার। আড়ালে রয়ে যায় তাদের সংগ্রামের গল্প।

এসব শিশুরা শিক্ষা, খেলাধুলা, বিনোদনের মতো সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত। স্বল্প বয়সে এমন কঠোর পরিশ্রম তাদের শারীরিক বৃদ্ধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, শিশুশ্রমের কারণে শিশুর মৌলিক অধিকার শিক্ষালাভের অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের প্রায় ১৮ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। এই শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না।

এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ মেজর (অব.) ডা. মোহাম্মাদ মেহেদী হাসান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিশুদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত হাড়ের বৃদ্ধি হয়। হাড়ের বৃদ্ধির জন্য এই সময়টাতে ভারি কাজ বা ভারি জিনিস বহন তাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্রমাগত এভাবে ভারি জিনিস বহন করলে তাদের মেরুদণ্ডের হাড়ের অনেক ক্ষতি হতে পারে। ফলে তাদের সুস্থ শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ৩০ বছর বয়সের পর থেকেই নানা সমস্যার দেখা শুরু হয়। যেমন মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয়, বেঁকে যাওয়া এমন আরও অনেক জটিলতা শুরু হয়।”

   

About

Popular Links

x