একসময় ঢাকার উপকণ্ঠে একটি নির্জন উচ্চবিত্ত আবাসিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত গুলশান এখন রাজধানী শহরের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ব্যস্ততম বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত। পুরানো এবং ছোট বাড়িগুলো ভেঙে গড়ে উঠছে সুউচ্চ ভবন। গুলশান এভিনিউ এবং এখানকার দুটি গোলচ্ত্ত্বর ঘিরে এখন অসংখ্য ভবন আর আর আলোর ঝলকানি।
১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা গুলশান মডেল টাউন সময়ের পরিক্রমায় নানা সুযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর আশেপাশে বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, বারিধারা, বসুন্ধরা এবং নিকুঞ্জের মতো এলাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
অভিজাত শপিংমল, সুপারস্টোর, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ব্যাংক, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাব, পার্লার জিমনেসিয়ামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুলশান এলাকায় দ্রুত বেড়েছে। যার ফলে অনেক বাড়ির মালিক তাদের ভবনকে বাণিজ্যিক ভবনে রুপান্তর করছেন।
অন্যদিকে, এখানকার কর্তৃপক্ষ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যার ফলে এখানে কূটনীতিকরা এবং অন্যান্য বিদেশিদের যাতায়াত বেশি।
গুলশান পৌরসভা ১৯৮২ সালে ঢাকা পৌরসভার সঙ্গে একীভূত হয়। ২০০৪ সালে গুলশানের কিছু অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করে সরকার। এরপরই গুলশান এলাকায় বাড়তে শুরু করে বাণিজ্যিক ভবন এবং দোকানের সংখ্যা। একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশচুম্বী হতে শুরু করে জমি ও ফ্ল্যাটের দাম ।
১৯ বছর পর এসে গুলশান এখন মেগাসিটি ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে গুলশানের ঝলমলে সৌন্দর্যের অপরপাশে রয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। সরু রাস্তা-ঘাট ও হকারদের দখলে থাকা ফুটপাত, ছোট-বড় দোকান, ড্রেনেজ অব্যবস্থপনা, নোংরা লেক, ফায়ার স্টেশন না থাকাসহ বেশকিছু সমস্যা রয়েছে এই এলকায়। এসব সমস্যা সমাধানে গুলশান সোসাইটি এবং পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে দাবি জানিয়ে আসছে।
গুলশানের ফুটপাত ও জনসমাগম স্থলের বেশিরভাগই হকার, চা বা অন্যান্য খাবারের দোকানদারদের দখলে; যা পথচারী ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, নষ্ট করছে পরিবেশ গুলশানের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এইসব স্থানগুলো বিভিন্ন অপরাধীদের উত্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে৷
ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিরতিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে তারা প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও গুলশান সোসাইটির সহযোগিতা চেয়েছে।
গুলশানের অফিস, মার্কেট এবং গৃহস্থালিতে কাজ করা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ সাধারণত ভাড়া বাড়িতে, মেসে এবং কাছাকাছি বস্তিতে থাকে। খাবার এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য তার রাস্তার পাশের দোকানের ওপর নির্ভরশীল। গুলশানের স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যার তুলনায় এসব মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
গুলশান ১ এবং ২ ডিএনসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড ও অঞ্চল ৩ এর আওতাধীন। এখানে প্রায় ৮.৪.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফুটপাত এবং ৫৯.১১ কিলোমিটার সরু রাস্তা রয়েছে।
ফুটপাতের পরিস্থিতি
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলশানের বেশিরভাগ ফুটপাত ছোট দোকান এবং অস্থায়ী দোকানদারদের দখলে রয়েছে। এছাড়া কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক বিভিন্ন বস্তুর দখলেও রয়েছে ফুটপাত, পাশাপাশি রাস্তার একটি বড় অংশ রযেছে গাড়ি পার্কিয়ের দখলে। গুলশান-১ এর গুলশান লেক ভিউ ও ডিএনসিসি মার্কেট এলাকায় রাস্তার ধারে অস্থায়ী খাবারের দোকান বেশি দেখা যায়।
ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে ফুটপাতে এক ব্যক্তিকে ফুলের তোড়া বিক্রি করতে দেখা যায়, যার ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ফুটপাথ ঝেড়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে ওই ফুল বিক্রেতা জানান, এজন্য তিনি অর্থ প্রদান করেন। তবে কে বা কারা টাকা আদায় করে তা জানাতে রাজি হননি তিনি।
একই অবস্থা গুলশান শপিং সেন্টারের সামনের ফুটপাতেরও। কেউ প্যান্ট ও টি-শার্ট বিক্রি করছে, আবার কেউ কেউ খাবার বিক্রি করছে। সেখানের কাপড় ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, "আমি এখানে প্রায় ১০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। কর্তৃপক্ষ যখন আমাদের উচ্ছেদ করে তখন আমরা এই জায়গাটি ছেড়ে যাই, তবে আমরা পরে আবার ব্যবসা শুরু করতে পারি। এছাড়াও আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু আমার পুঁজি নেই, তাই এই ফুটপাতই আমার ভরসা।"
রুহুল নামে এক ঘড়ি ব্যবসায়ী বলেন, "গুলশানের সব ক্রেতাই কোটিপতি নয়। আমাদের মতো গরিব মানুষ আছে। আমরা ফুটপাতে ব্যবসা করে তাদের চাহিদা পূরণ করি।"
গুলশান-১ মোড়ের প্রায় প্রতিটি সড়কের ফুটপাতই হকারদের দখলে।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নওশীন বলেন, "আমি প্রতিদিন এই রুট দিয়ে যাতায়াত করি। এমন কোনো দিন নেই যে আমাকে যানজটের সম্মুখীন হতে হয় না। ফুটপাত দিয়েও হাঁটার সুযোগও নেই। এমন অভিজাত এলাকার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে অন্য এলাকার অবস্থা কী?”
গুলশান-১-এর রবি টাওয়ার পার হলেই মূল সড়কের পাশের রাস্তায় ছাউনি দেওয়া দোকানগুলো দেখতে পাবেন যে কেউ। রাস্তার পাশের খাবারের দোকানের পাশে ড্রেনের মুখে ময়লার স্তূপ। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সকালের নাস্তা বা দুপুরের খাবার, জলখাবার এবং চা খেতে ভিড় জমান ক্রেতারা।
ভ্রাম্যমাণ হকাররা সিগারেট এবং চিনাবাদামসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন, ক্রেতা পেতে ভিড়ের জায়গা এবং ফুটপাতে তাদের উপিস্থিতি বেশি।
গুলশানের একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট কোম্পানিতে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত আকবর বলেন, "আমি প্রায়ই এখানে দুপুরের খাবার খাই। মাঝে মাঝে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসি, কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয় না। তাছাড়া রেস্টুরেন্ট ও হোটেল থেকে খাবার কেনা গুলশানে ব্যয়বহুল। তাই আমরা একটু হেঁটে এসে এখানে খাই।"
গুলশানে প্রশস্ত ফুটপাত বিশিষ্ট একটি বিখ্যাত শপিং মল পিঙ্ক সিটি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাবারের অস্থায়ী স্টল এখানকার ফুটপাতে আধিপত্য বাড়ছে।
এছাড়া গুলশানের ২৩ নম্বর রোডে নিয়মিত জুয়ার আসর বসানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
শুধু হকাররাই নয়, বড় বড় হোটেল ও ব্র্যান্ডের দোকানগুলোর সামনেও গাড়ি পার্কিংয়ের নামে ফুটপাত দখল করে চলছে বাণিজ্য।
গুলশান-২ এর প্রধান সড়কের পাশের ফুটপাথগুলো কিছুটা ফাঁকা থাকলেও গলিতে ফুটপাথ দখল করে স্টল বসিয়েছেন অনেকে। ডিএনসিসি একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার দোকান বসিয়েছে তারা।
ক্ষুব্ধ স্থায়ী বাসিন্দারা
ফুটপাত যেকোনো মডেল টাউনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে, গুলশানের ফুটপাতের এমন নৈরাজ্যে হতাশ এখানকার বাসিন্দারা।
গুলশান-২ এলাকার বাসিন্দা তামজিদ হোসেন বলেন, "গুলশানের মতো এলাকায় এমন দৃশ্য কখনোই কাম্য নয়। ফুটপাতের বেশির ভাগই দখল হয়ে গেছে... যে কেউ রাস্তার ধারে দোকান খুলছে।"
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "এরা কারা এবং কোথা থেকে আসছে তা জানা নেই। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এখন মনে হচ্ছে, কোনো দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত প্রশাসন কোনো কথা বলবে না।"
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদা বলেন, “গুলশান অভিজাত এলাকা এটা ঠিক, কিন্তু এখানে সবাই এক নয়। নিম্ন আয়ের মানুষ ফুটপাতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে।
তিনি আরও বলেন, "এর কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া, নিম্ন আয়ের মানুষ আগামী নির্বাচনের টার্গেট। তাই তাদের ফুটপাত ও রাস্তা থেকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়।"
ডিএনসিসি অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী কর্মকর্তা জুলকার নাইন জানান, অভিযোগ পেয়ে তারা সবসময় ফুটপাত থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করেন। কিন্তু পরের দিন আবারও দখল হয়ে যায় ফুটপাতগুলো।
তিনি বলেন, “শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য পুলিশ প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গুলশান সোসাইটির সহযোগিতা প্রয়োজন।"
স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "আমরা প্রতিদিন অভিযান চালাতে পারি না। পুলিশের গাড়ি নিয়মিত টহল দিলে এই সমস্যার সমাধান হবে। এছাড়াও, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং গুলশান সোসাইটির সদস্যরা সহযোগিতা করলে আমাদের জন্য সহজ হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে আমরা বনানীতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি।"
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান, ফুটপাতে যেন একটি দোকানও না থাকে সে বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য তিনি পুলিশ প্রশাসন, গুলশান সোসাইটি ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা কামনা করেন।



