ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে জাতীয় সংসদে বহুল আলোচিত “সাইবার নিরাপত্তা বিল-২০২৩” পাস হয়েছে। বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কয়েকটি ধারা বহাল রাখা হয়েছে। এরমধ্যে চারটি ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পাবেন না। এছাড়া বিলের ৪২ ধারা অনুযায়ী সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবে পুলিশ। এই আইনে দায়ের করা মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেজন্য বাদীকে শাস্তি পেতে হবে।
সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, সাংবাদিক সংগঠন, কূটনীতিক এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ জানিয়ে বলছেন, “এই আইনটি ভিন্নমত ও মুক্ত চিন্তাকে দমন করার অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে।”
সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ না পেয়ে তাড়াহুড়ো করে সংসদে বিলটি পাস করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
বিলটি পাসের জন্য ক্ষমতাসীন দল তাড়াহুড়ো করছে কেন, এমন কথা জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি খুবই কার্যকর হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা একটি ডিজিটাল যুগে বাস করছি। জনগণ নিবিড়ভাবে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছে। আমি মনে করি পরবর্তী নির্বাচনী প্রচার হবে ডিজিটাল স্পেসের উপর ভিত্তি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার নির্ধারিত কোনো আইন বা নিষেধাজ্ঞা না থাকলে যে কেউ কিছু করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো খুব বিপজ্জনক হতে পারে। সাইবারস্পেসে মিথ্যা তথ্য, প্রচার ও ঘৃণামূলক বক্তব্য পরবর্তী নির্বাচনকে বানচাল করতে পারে।”
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সিএসএ পাসের তালিকায় ছিল না। তবে একাদশ জাতীয় সংসদের ২৪তম অধিবেশনই শেষ হতে পারে বলে কিছু আলোচনা ছিল। তারপর এই বিলটি তালিকায় নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সংসদের ২৪ তম অধিবেশন স্থগিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “এটিই হবে শেষ অধিবেশন।”
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বিলটি বাতিলের উদ্দেশ্য ছিল না ক্ষমতাসীন দলের। তবে ডিএসএ বাতিলের পরে সাইবারস্পেসের জন্য সুরক্ষা হিসাবে কাজ করতে পারে এমন কোনো আইন ছিল না।
বিলের ৪২ ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। এই ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এই ধারায় পরিদর্শক পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা ডিএসএতেও ছিল।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক শুক্রবার বলেন, “সিএসএ অপরাধ ব্যতীত ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের অনুমতি দেয় না।”
তিনি বলেন, “কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাকিং বা ক্ষতি করার মতো প্রযুক্তিগত অপরাধের জন্য সিএসএ'তে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারা সাংবাদিকদের আপত্তি ছিল, তা উল্লেখযোগ্য সংশোধন করা হয়েছে।”
পরোয়ানাহীন গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, এই চারটি ধারা প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত হবে।
মন্ত্রী বলেন, “বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমালোচনা নতুন আইন সম্পর্কে ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হচ্ছে। ডিএসএ-এর যে ধারায় সাংবাদিক সমাজ আপত্তি জানিয়েছিল তা আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সুপারিশ নেওয়ার বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, “নতুন আইনটি আন্তর্জাতিক মান পূরণের জন্য পর্যালোচনা করার ও মতামত দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশ সরকার।”
এতে বলা হয়, “দুর্ভাগ্যবশত সংসদে পাস পওয়া সাইবার নিরাপত্তা আইন অনেক দিক দিয়েই এর আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো। এই আইনেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, জামিন অযোগ্য ধারা বহাল রাখা হয়েছে এবং সমালোচকদের গ্রেপ্তার, আটক ও কণ্ঠরোধ করতে খুব সহজেই এর অপব্যবহার হতে পারে।”
তবে মার্কিন দূতাবাসের বক্তব্যের আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেছেন, “সরকার সব উদ্বেগ বিবেচনা করেছে।”
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে দুই মন্ত্রী বলেন, “সরকার স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে কোনো সুপারিশ নেয়নি এটা ঠিক নয়।”
মন্ত্রিসভার বৈঠকে গত ৭ আগস্ট বিলটি তোলা হয়। খসড়া আইনের বিষয়ে জনগণের মতামত নিতে ১০ আগস্ট থেকে ১৪ দিনের সময় বেধে দেওয়া হয়। পরে বিলটি আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
আইসিটি বিভাগ সূত্র জানায়, তারা প্রায় ৫০০ মতামত ও সুপারিশ এসেছে। যেহেতু অনেক অভিন্ন মতামত বিভিন্ন নামে এসেছে, কর্মকর্তারা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ১৭৬টি মতামত পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান।



