Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাস্তার সস্তা হোটেলেও খেতে পারছেন না নিম্নআয়ের মানুষ

  • ৩০-৩৫ টাকার খাবারের দাম এখন ৭০-৮০ টাকা
  • খরচ কমাতে সিঙ্গারা-পুরি খাচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ
  • ছোট দোকানিরাও হতাশ
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:৫০ পিএম

নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। ফলে বেড়েছে হোটেল-রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম। স্বল্প আয়ের মানুষ এখন তিন বেলা খাওয়ার টাকা যোগাতে পারছেন না। বাধ্য হয়েই তাদের অনেকে পুরি-সিঙ্গারা খাচ্ছেন এক বেলায়।

মোহাম্মদ হানিফ, ৪৫ বছর বয়সী মানুষটি প্রায় ১৩ বছর ধরে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার একটি ঝুপড়ি দোকানে দুপুরের খাবার খেতে এসেছেন তিনি।

কথা হয় হানিফের সঙ্গে। ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “হোটেলে কখনো ভাজি দিয়ে খাই, কখনো ডাল দিয়ে। মাছ-মাংস দিয়ে এখন আর খেতে পারি না। দাম বেড়ে গেছে। সারাদিন কাজ করার পর যা পাই তা দিয়ে বাজার খরচও হয় না, হোটেলের খাবারও হয় না।”

একসময় হানিফের স্ত্রী-সন্তানরাও তার সঙ্গে ঢাকাতেই থাকতেন। এখন চড়ামূল্যের বাজারে কুলিয়ে উঠতে না পেরে বাকি সবাইকে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আগে তিন বেলা হোটেলে খেয়েছি। এখন এক বা দুইবেলা খেতে পারি। অন্য সময় সিঙ্গারা বা পুরি খেয়ে থাকতে হয়। আগে হোটেলে ৩০-৩৫ টাকা দিয়ে পেট ভরে খেতে পারতাম। এখন এগুলো হয়ে গেছে ৭০-৮০ টাকা। অবস্থা এমন যে, নিজেও খেতে পারি না, বউকেও কিছু পাঠাতে পারি না।”

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ারের সামনে ফুটপাতের দোকানে চা-রুটি খাচ্ছিলেন রিকশাচালক মো. জিকিরুল্লাহ।

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আগে একটা রুটির দাম ছিল ১০ টাকা, এখন ১৫ টাকা। এক কাপ চায়ের দাম ছিল পাঁচ টাকা, এখন কমপক্ষে আট টাকা। সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা পাই, তাতে হোটেলে খেলে পকেটে আর কিছুই থাকে না। এজন্য এখন চা-রুটি খেয়ে কাজ করি।”

জিকিরুল্লাহ আরও বলেন, “সকাল ৯টায় রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। এখন বাজে প্রায় সাড়ে ১২টা। এখন পর্যন্ত ৬০ টাকা আয় হয়েছে। যাত্রী এখন আগের তুলনায় কম। আগে রিকশার জমা ছিল ১০০ টাকা এখন হয়েছে ১৫০ টাকা। আমাদের আয় বাড়েনি, উল্টো যাত্রী কমে গেছে। কিন্তু খরচ অনেক বেড়ে গেছে।”

খরচ কমাতে অনেকেই সিঙ্গারা-পুরি খেয়ে থাকছেন/মেহেদি হাসান রনি/ঢাকা ট্রিবিউন

ছোট দোকানিরাও হতাশ

রিকশাচালক হানিফ যে দোকানে খাওয়াদাওয়া করছিলেন সেটির মালিক মো. জামাল। তিনি জানালেন, ক্রেতার অভাবে দোকান চালু রাখাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

ঢাকা ট্রিবিউনকে জামাল বলেন, “পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এমন অবস্থায় আগে কখনো পড়িনি। আগে ব্যবসা করেছি একরকম, এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। টাকা নিয়ে বাজারে গেলে মনমতো জিনিসপত্র পাই না।”

তিনি আরও বলেন, “আমার হোটেলে যারা খায়, তাদের থেকে দুই টাকা বেশি নেওয়ার অবস্থাও নাই। এই হোটেল চালিয়ে এখন আর কোনো আয় হয় না। দিন শেষে ১০০ টাকা সঞ্চয় করতেও খুব কষ্ট হয়।”

কোন খাবারগুলোর চাহিদা বেশি জানতে চাইলে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “কাস্টমাররা সকালে ২০ টাকা দিয়ে আলুভর্তা আর ভাত খায়। এক প্লেট ভাত ১০ টাকা আর একটা আলুভর্তা ১০ টাকা। দুপুরে থাকে থাকে রুই মাছ, মুরগি। এগুলো ৬০ টাকা করে বিক্রি করি। এছাড়াও আছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, ডিম।”

ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডের এনাম র‍্যাংসের সামনের ফুটপাথে খাবার বিক্রি করেন সাহেরা খাতুন। তার দোকানে ভাত খাচ্ছিলেন পাঁচজন রিকশাচালক। হাড়ভাঙা খাটুনির পর তাদের মধ্যে তিনজনই সবজি-ডাল দিয়ে কোনোমতে পেটে জামিন দিচ্ছিলেন।

হোটেলে খাবারের দাম বেড়েছে কি-না জানতে চাইলে সাহেরা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখন সবকিছুর দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের খাবারের দাম বাড়াতে পারছি না। দাম বাড়ালে কাস্টমার খাইতে চায় না।”

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের দোকানগুলোতে খাওয়া-দাওয়া করেন শ্রমজীবী মানুষ। যাদের একটি বড় অংশ রিকশাচালক। এসব দোকানের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন দিনমজুর, ডেলিভারিম্যান ইত্যাদি পেশার মানুষ।

এখন এসব হোটেলেও ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকার আশেপাশে। যা আগে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। পাঙাশ, তেলাপিয়া, কই মাছ আগে বিক্রি হতো ৩০-৩৫ টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ভর্তার দাম খুব একটা পরিমাণে কম দিচ্ছেন দোকানিরা। আগে এক বাটি ডাল ছিল পাঁচ টাকা, এখন ১০ টাকা। আগে যেসব সবজি-ভাজির দাম ছিল ১৫ টাকা এখন সেগুলো ২৫ টাকা।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়। এটা স্বাভাবিক। যখন একটা মুদ্রাস্ফীতির পরিবেশ বিরাজ করে, তখন ফুটপাতের দোকানের খাবার দাবারের দাম বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আর মুদ্রাস্ফীতি যখন দেখা দেয়, তখন সবার মধ্যে দাম বাড়ানোর একটা প্রবণতা দেখা দেয়। সে প্রবণতাও এসব দোকানেও রয়েছে।”

   

About

Popular Links

x