Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

৪১৪ বছরের পুরোনো আতিয়া মসজিদ কি অবহেলার শিকার?

সাঈদ খান পন্নী ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। নির্মাণের পর ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরী ও ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবি মসজিদটি সংস্কার করেন বলে জানা যায়

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:০১ পিএম

প্রত্যেক দেশ ও জাতির নিজস্ব কিছু স্থাপত্য এবং নিদর্শন থাকে। যা তাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করে। হাজার বছর ধরে আবহমান এই বাংলায় বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর লোকের বসবাস। এই ভূখণ্ডের শাসনকার্যও চালিয়েছে পৃথিবীর নানাপ্রান্তের নানা প্রভাবশালী শাসক ও জাতিগোষ্ঠী।

মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতান, মুঘল বা ইংরেজরা তাদের নিজ নিজ ভাবনা-স্থাপত্য ধারণা বাংলার মানুষ ও সংস্কৃতির মিশেলে সমৃদ্ধ করেছেন। অসংখ্য মন্দির, মসজিদ, স্তূপা, বিহার ও প্রাসাদ বানিয়েছেন তারা। তেমনি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে এই মসজিদটি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালের চিহ্ন বহন করা মসজিদটি ১৬০৯ সালে নির্মাণ করেন বিখ্যাত জমিদার বায়েজিদ খান পন্নীর পুত্র সাঈদ খান পন্নী। প্রখ্যাত স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ মসজিদের পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। প্রায় ৪১৪ বছরের পুরোনো এই মসজিদটির কারুকাজ এখনো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এলাকার নামানুসারেই মসজিদের নামকরণ করা হয় আতিয়া মসজিদ।

১৯৮০ দশকে ১০ টাকার নোটে আতিয়া মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হলে মসজিদটি দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদে প্রথম আতিয়া মসজিদ স্থান পায়। এরপর ১৯৮২ সালে পরিবর্তন হওয়া ১০ টাকার নোটের প্রচ্ছদেও স্থান পায় মসজিদটি। তবে বর্তমানে ১০ টাকার নোটে এই মসজিদটির ছবি আর দেওয়া হয় না।

মসজিদটির সংস্কার করা জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মসজিদের জন্য রাস্তা নির্মাণ করতে হবে; মসজিদটি সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি টাকায় আতিয়া জামে মসজিদটির ছবি আবারও প্রতিস্থাপন করতে হবে।

টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। সাড়ে ৭ ফুট প্রশস্ত দেয়াল বিশিষ্ট আতিয়া মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৫৯ ফুট ও ৪০ ফুট। চার কোণে চারটি বিরাট অষ্টকোণাকৃতির মিনার রয়েছে। মিনারগুলো ছাদের অনেক উপরে উঠে ছোট গম্বুজে শেষ হয়েছে। অনন্য স্থাপত্য এ মসজিদের প্রধান কক্ষ ও বারান্দা দুইভাগে বিভক্ত। প্রধান কক্ষ বর্গাকৃতি। এর ভেতরটা ২৫ ফুট লম্বা। এ কক্ষের উপর চমৎকার একটি গম্বুজ রয়েছে। প্রধান কক্ষের পূর্ব পাশে বারান্দা। বারান্দার ওপর রয়েছে তিনটি ছোট গম্বুজ। পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ এবং সামান্য ওপর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ একটি মোল্ডিং চলে গেছে। সুলতানি আমলের মসজিদের মতো পূর্ব দেয়ালের কার্নিশ ও প্যারাপেট বাঁকানো। প্যারাপেটের উপরিভাগে ব্যাটলম্যান্টে চিত্রিত। মসজিদের পাশে একটি স্কুল ও পুকুর রয়েছে।

মসজিদের পূর্ব ও উত্তর দিকের বাইরের দেয়ালে টেরাকোটার ওপর চমৎকার বৃত্তের মাঝে ফুলের নকশা করা হয়েছে। চুন, সুরকির গাঁথুনি দিয়ে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পরীতির সমন্বয়ে নির্মিত এ মসজিদের পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজে নিযুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ। নির্মাণের পর ১৮৩৭ সালে রওশন খাতুন চৌধুরী ও ১৯০৯ সালে আবুল আহমেদ খান গজনবি মসজিদটি সংস্কার করেন বলে জানা যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, পঞ্চদশ শতকে এই অঞ্চলে আদম শাহ বাবা কাশ্মিরি নামের এক সুফি ধর্মপ্রচারক আসেন। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। তার কবরও এখানেই অবস্থিত।

শাহ কাশ্মিরির অনুরোধে সাঈদ খান পন্নীকে আতিয়া পরগণার শাসক নিয়োগ করেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। সাঈদ খান পন্নীই করোটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন।

সরেজমিনে রবিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দেখা যায়, মসজিদটি দেখতে অনেকেই এসেছেন। মসজিদে নতুন করে রং করা হয়েছে। তবে কারুকাজগুলো করা হয়নি। মসজিদে আসার জন্য রাস্তাটির অবস্থা বেহাল।

আতিয়া মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি আশরাফ হোসেন মানিক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী বেশি আসেন। অনেক সময় বিদেশ থেকেও পর্যটকরা আসেন। মসজিদটি সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়নে রয়েছে।”

তিনি মনে করেন, মসজিদটি সংস্কার দরকার। তিনি জানান, কিছুদিন আগে মসজিদের কিছু কাজ করেছে কর্তৃপক্ষ। কাজগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া যে কাজগুলো করা হচ্ছিল  সেগুলো অসমাপ্ত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের এই মসজিদে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। অন্য সময় নামাজ পড়তে কোনো সমস্যা হয় না। তবে শুক্রবারের জুমআর নামাজ পড়তে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই মসজিদটি বর্ধিত করার দাবি করছি।

মসজিদের মোয়াজ্জিন রফিকুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের মসজিদের কিছু কাজ হলেও কারুকাজগুলো করা হয়নি। আমাদের মসজিদের যাতায়াতের রাস্তা নেই। যাতায়াতের জন্য রাস্তা করা জরুরি। শুক্রবার জুমআর নামাজের সময় মসজিদে মুসল্লিদের সংকুলন হয় না। মুসল্লি সংকুলানের জন্য মসজিদটি বর্ধিত করার দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলাম বলেন, “উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং মসজিদ কমিটির লোকজন নিয়ে মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যাপারে যা যা করার প্রয়োজন মনে হয় তা করার চেষ্টা করা হবে। রাস্তার সমস্যার সমাধানও শিগগিরই করার চেষ্টা করব।”

About

Popular Links