Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রান্তিক মানুষের হার না-মানা নেত্রী জগবতি টপ্পো

নওগাঁয় সমাজের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের অসম লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শ্রীমতি জগবতি রানী টপ্পো

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৭:০৫ পিএম

এ বছরের মার্চে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাখা হয়নি দেশটির প্রথম সাঁওতাল প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুকে। এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। বিপুল সংখ্যক জাতিবৈচিত্র্য ও বৃহত্তর গণতন্ত্রের দেশ ভারতেই এই পরিস্থিতি- তা নয়। সারাবিশ্বের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুসহ নানা শ্রেণিপেশার সংখ্যালঘুরা অবহেলিত। মূলধারার একজন নাগরিকের যে লড়াই- তার থেকে হাজারগুণ বেশি লড়তে হয় তাদের।

বাংলাদেশেও জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি; তবে দিনদিন অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এখনো দেশের নানাপ্রান্তে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আছেন। নওগাঁয় সমাজের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের অসম লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শ্রীমতি জগবতি রানী টপ্পো।

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের লক্ষীকুল গ্রামের বাসিন্দা জগবতি রানী টপ্পো। সাত বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ। অভারের সংসারে নানাবিধ প্রতিকূলতার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এরপর আর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। ২০০০ সালে শ্রী জতীন্দ্রনাথ তির্কীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শুরু হয় নতুন এক জীবন। স্বামীর প্রেরণায় একদিকে সমাজসেবামূলক কাজে মনোযোগী হন অন্যদিকে শুরু করেন স্থগিত হওয়া পড়ালেখা। ২০০৫ সালে বিএ পাশ করেন।

জগবতি টপ্পো বুঝতে পারেন সকলের জন্য কাজ করতে হলে কোনো একটি সাংগঠনিক উপায় বের করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেন। নিজের এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। কিন্তু জয় থেকে যায় অধরা। নিজের সামাজিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। সেইসঙ্গে জনসংযোগ চালিয়ে যান। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েও ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যেতে হয়।

এবার পরাজয় থেকে শক্তি নেন তিনি। “অপরাজিতা” নামে একটি প্রকল্পে যুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নিজের দক্ষতা আর জ্ঞানের প্রসারে কাজ শুরু করেন। বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-শিশুর বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ান তিনি। এলাকায় হয়ে ওঠেন তুমুল জনপ্রিয়।

২০২১ সালে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে প্রস্তুতি নেন পুরোদমে। সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন। নির্বাচনের কুসংস্কৃতির শিকার হন তিনি। নির্বাচনের আগে তাকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয় পোস্টার, ভেঙে দেওয়া হয় প্রচার মাইক, ভোটকেন্দ্র থেকে সমর্থকদের মারপিট করে বের করে দেওয়া হয়। তবে শেষ হাসিটা হাসতে পারেন জগবতি টপ্পো। ২২ হাজার ভোটে বিজয়ী হন তিনি।

লড়াকু জগবতি টপ্পো নিজেই মোটরসাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করেন। অদম্য ইচ্ছে শক্তি দিয়ে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী হয়েও তিনি জয় করেছেন মানুষের হৃদয়। সমাজের সকল বৈষম্যের দিকে আঙুল তুলছেন তিনি। ভাঙতে চাচ্ছেন মানুষে মানুষের বিভেদ। আর লড়াই করছেন পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে।

সমতার সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিকতাকে পরাজিত করে সামাজিক অনুশাসন, ধর্ম, অর্থ ও পেশীশক্তিকে মোকাবিলা এগিয়ে চলছেন তিনি। তিনি জানান, তার এই লড়াই আমৃত্যু অব্যাহত থাকবে। জগবতি টপ্পো এখন তার নিজের জাতিগোষ্ঠীর কাছে, পিছিয়ে পড়া স্থানয়ি মানুষের কাছে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা বলেন, “জগবতিটপ্পো সত্যিই সকলের জন্য এক দৃষ্টান্ত। জগবতির পাশে জেলা প্রশাসন রয়েছে। তাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

   

About

Popular Links

x