দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৩.৮% বিষণ্ণতা এবং ৬২.৬% উদ্বিগ্নতায় ভুগছেন। অন্যদিকে, ৫৫% প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতা উভয় লক্ষণ রয়েছে বলে সম্প্রতি এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে।
এছাড়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩.২১ গুণ বেশি। আইসিডিডিআর,বি এবং সেন্টার ফর ডিসঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) পরিচালিত “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার ও ঝুঁকি” শীর্ষক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল - হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন পরিচালিত “রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অনানুষ্ঠানিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং মনোঃসামাজিক সহায়তার প্রভাব বিশ্লেষণ” শীর্ষক আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং মনোঃসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা সম্পন্ন হওয়ার ছয় থেকে দশ মাস পর ২৯% ব্যক্তি আবারও একই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭% ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মনোঃসামাজিক সমস্যায় ভুগেছেন বলে জানিয়েছেন।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া ৮৪% ব্যক্তি প্রাপ্ত সহায়তার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলা করছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ৮১%।
বুধবার (১ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকার বনানীর একটি হোটেলে ঢাকা ট্রিবিউনের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ডিসঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি), সিবিএম গ্লোবাল ডিজ্যাবিলিটি ইনক্লুশন এবং হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল-হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন আয়োজিত, “বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং পরিষেবা: মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকার এবং গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বৈঠকে আলোচকরা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা চালু করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং সমাধান করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং মনোঃসামাজিক সহায়তা বিষয়ক কারিগরি বিশেষজ্ঞ ফারহানা নাজনীন এবং সিডিডির সমন্বয়কারী তাসলিমা আক্তার কেয়া।
চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান
মূল প্রবন্ধে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ভিত্তিতে (চারটি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল) বর্তমান ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে কিছু সুপারিশ করা হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দূর করার জন্য কিছু সমাধানও এতে তুলে ধরা হয়।
এতে আরও বলা হয় যে, দেশে মাত্র ০.৪৯% মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ রয়েছে। দেশে প্রতি এক লাখ মানুষেরর জন্য মাত্র ০.১৬ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ০.৩৪ জন মনোবিজ্ঞানী এবং ০.৪ জন নার্স রয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের আগমনের পর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার “মেন্টাল হেলথ গ্যাপ” কর্মসূচির আওতায় ৩০২ জন চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী এবং কাউন্সেলরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে থেকে দশ হাজার ত্রিশ জন চিকিৎসক, সাড়ে চার হাজার নার্স এবং উপ-সহাকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের বেশিরভাগ শহরাঞ্চলে কর্মরত, বিশেষ করে ঢাকায় কেন্দ্রীক।
বৈঠকে এইচআই বাংলাদেশের টেকনিক্যাল ইউনিট ম্যানেজার ডা. ইসরাত জাহান বলেন, “জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০১৯ অনুযায়ী, ১৮.৭% প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।” গ্রামীণ এলাকায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই অপ্রতুল এবং গ্রামীণ পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এডিডি ইন্টারন্যাশনালের মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির ফোকাল পার্সন আবদুল্লাহ হারুন বলেন, “দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। এমনকি কিছু জায়গায় এমনও দেখা গেছে যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্দেশিত নকশা ও পরিমাপ সঠিকভাবে মানা হয়নি।”
তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, “বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো খুব সীমিত। তবে দিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।”
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. অভ্র দাস ভৌমিক বলেন, “তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য পৌঁছে দিতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ধর্মীয় নেতাসহ স্থানীয়দের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতা ও ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। যাতে তারা সাধারণ মানুষের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করতে পারে।”
সিডিডি’র নির্বাহী পরিচালক এএইচএম নোমান খান তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবাদানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি যে, এসব সেবাদানকারীর বিভিন্ন ধরনের মানসকি স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই, এই সেবাদানকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মায়েদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়।”
সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন, বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মুহাম্মদ মুশফিকুল ওয়ারা বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু করতে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক উদ্যোগকে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহারিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিতে হবে।”
হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজেশ চন্দ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি সংস্থা, এনজিও এবং সুশীল সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন। সরকার ও অন্যান্য অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশনের প্রতিশ্রুতি পুর্নব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকটি পরিচালনা করেন ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ। এতে সরকারি কর্মকর্তা, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা অংশ নেন।



