কোনো বাল্কহেড ধাক্কা দেয়নি, বরং নিচ দিয়ে পানি উঠে রজনীগন্ধা ফেরি পদ্মায় ডুবে গেছে বলে দাবি করেছেন বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিতে পানি ওঠে এবং সেটি ধীরে ধীরে ডুবে যায়। আর নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডুবোচরে আটকে তলা ফেটে যায় ফেরিটির।
মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের কাছে বুধবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ৮টার দিকে ফেরি ডুবির এ ঘটনা ঘটে।
এরপর আরিচা ফায়ার স্টেশনের ডুবুরি ইউনিট সেখানে গিয়ে কাজ শুরু করে। ঢাকার সিদ্দিক বাজার থেকে আরো একটি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। যোগ দেয় নৌ বাহিনীর ডুবুরি দলও। ছয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, কয়েকজন আগেই সাঁতরে তীরে ওঠেন। তবে বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, ফেরির সেকেন্ড মাস্টার (চালকের সহকারী) হুমায়ুন কবির (৩৯) নিখোঁজ আছেন।
এর আগে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসে ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি রজনীগন্ধা। ফেরিতে ছোট-বড় ৯টি ট্রাক ছিল। ঘন কুয়াশায় রাত দেড়টার দিকে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে ফেরিটি আটকে যায়। এ সময় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। আজ সকাল আটটার পরপরই ফেরিটি ডুবে যেতে থাকে। তখন যানবাহনের চালক, সহকারী ও ফেরিতে কর্মরত লোকজন দ্রুত নদীতে ঝাঁপ দেন।
ডুবে যাওয়া ফেরি থেকে বেঁচে যাওয়া ট্রাক চালকের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বলছেন, ফেরিটিতে বাল্কহেডের কোনো ধাক্কার দৃশ্য দেখা কিংবা তার শব্দ তারা শোনেননি।
তুলাবোঝাই ট্রাক নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে গাজীপুর যাচ্ছিলেন চালক আশিক শেখ। তার ট্রাকটিও ফেরির সঙ্গে ডুবে যায়। আশিক বলেন, “কুয়াশার কারণে ফেরিটি আটকা পড়ে এবং আমরা অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ ফেরির এক কর্মচারী চিৎকার করে বলে যে, ফেরিতে পানি ঢুকছে। তিনি আমাদের নদীতে ঝাঁপ দিতে বলেন।”
আশিক বলেন, “তারা আমাদের কোনো লাইফ জ্যাকেট বা কিছুই দেয়নি। আমি নদীতে ঝাঁপ দিই এবং সাঁতরে জীবন বাঁচাই।”
ফেরিতে থাকা আরেক ট্রাকের চালক সাজ্জাদ আলী বলেন, “রাত দেড়টার দিকে ফেরিটি আটকা পড়ে এবং কেউ কেউ বলছিল ফেরি ডুবোচরে আটকে গেছে। কিন্তু জানতে পারি, ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমরা ফেরিতেই ছিলাম। পরে ফেরির এক কর্মী আমাদের জানান, এটি ডুবে যাচ্ছে। ফেরিতে ধীরে ধীরে পানি ওঠে এবং এক পর্যায়ে ডুবে যায়।”
তিনি বলেন, “কোনো সংঘর্ষ হয়নি এবং আমরা কোনো আওয়াজও শুনিনি।”
তবে বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, বাল্কহেডের সঙ্গে ফেরির সংঘর্ষে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বিআইডব্লিউটিসি আরিচা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক শাহ মো. খালেদ নেওয়াজ বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে শুনেছি বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিটি ডুবে গেছে। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরে বলা যাবে।”
অন্যদিকে, নৌ পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, “ফেরিটি দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটের আসার পথে ডুবোচরে ধাক্কা লাগে। এতে ফেরির তলা ফুটো হয়ে গেলে পানি ঢুকতে থাকে। তবে কুয়াশায় পথ দেখতে না পেয়ে পাটুরিয়া ঘাটের ২০০ থেকে ২৫০ গজ অদূরে রজনীগন্ধা ফেরিটি নোঙর করে। এরপর ফেরিতে ধীরে ধীরে পানি ঢুকে সকাল আটটার দিকে নয়টি ট্রাকসহ ফেরিটি নদীতে ডুবে যায়।”
ফেরি ডুবে যাওয়া নিয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, “ঘন কুয়াশার কারণে ফেরিটি ঘাটের কাছাকাছি নোঙর করা ছিল। একটি ছোট মালবাহী জাহাজ ফেরিটিকে ধাক্কা দিলে সেটি ডুবে যায়। ফেরির সহকারী চালককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
এদিকে ফেরি ডুবির ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সানজিদা জেসমীনকে প্রধান করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। আগামী সাতকার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
আর বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মতিউর রহমান জানিয়েছেন, এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তারা পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করেছেন।
ফেরির ডুবির খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) রেহেনা আকতার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন, “ঠিক কী কারণে ফেরিটি ডুবিছে তা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।”



