Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টাঙ্গাইল শাড়ি নিজেদের দাবি করে সমালোচনার মুখে ভারত

  • হিন্দু ধর্মাবলম্বী বসাক সম্প্রদায় টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি ছিল
  • ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর টাঙ্গাইল থেকে অনেক তাঁতি ভারতে চলে যান
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩৩ পিএম

বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ির উৎস পশ্চিমবঙ্গ-এমনটা দাবি করেছে ভারতীয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। বিতর্কিত দাবিটি মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল পেজে একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে করা হয়েছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।

পোস্টে দাবি করা হয়েছে, “টাঙ্গাইল শাড়ি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত একটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। সূক্ষ্ম উপস্থাপন, প্রাণবন্ত রং এবং জটিল বুননের জন্য শাড়িটি বিখ্যাত, এটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতিটি টাঙ্গাইল শাড়ি দক্ষ কারুকার্যের প্রমাণ; এটি ঐতিহ্য এবং কমনীয়তাকে একত্রিত করে।“

দেশটির সরকারি দপ্তরের এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে, মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের বিবৃতির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। টাঙ্গাইলের শাড়ির পরিচয় নিয়ে বিতর্কে জড়ানো এবারই প্রথম নয়। কলকাতা বিমানবন্দরে একটি বাণিজ্যিক শাড়ির উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, এটিকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ফুলিয়ায় হাতে বোনা হিসেবে চিহ্নিত করে।

জিআই অবস্থা

ভারতীয় নিবন্ধকের তথ্য অনুসারে, কলকাতা-ভিত্তিক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হ্যান্ডলুম উইভারস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের একটি আবেদনের জবাবে বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ি ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি ইন্ডিয়ান জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশন ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত হয়। ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর করা ওই আবেদন পরবর্তীতে নিবন্ধিত করে দেওয়া হয়। বলা হয়, এই দাবি ৭ সেপ্টেম্বর, ২০৩০ পর্যন্ত বৈধ থাকবে।

এদিকে, বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন কীভাবে টাঙ্গাইল শাড়ি, আনারস, এবং সন্দেশ (দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি) জিআই মর্যাদা সুরক্ষিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য গত ৩০ জানুয়ারি একটি সভা করে। জেলা প্রশাসক কায়সারুল ইসলাম বলেন, তারা টাঙ্গাইলের তিনটি আইকনিক পণ্যের জন্য জিআই মর্যাদার জন্য আবেদন করেছেন এবং আশা করি শিগগিরই স্বীকৃতি পাবেন।

দাবির পেছনে রাজনীতি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, টাঙ্গাইল থেকে অনেক তাঁতি ভারতে চলে যান, পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপ, ফুলিয়া, সমুদ্রগড়, শ্রীরামপুর এবং নসরতপুর এলাকায় বসতি স্থাপন করে। তারা ভারতীয়দের টাঙ্গাইল শাড়ি বুননের শিল্প শেখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বর্তমানে, টাঙ্গাইলের শাড়ি ভারতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পলিয়েস্টার থ্রেড এবং মেশিনের বুনন থেকে তৈরি বিভিন্ন শাড়ির প্রসারের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ির মূল্য হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় টাঙ্গাইলের সুতি শাড়িগুলো তাদের সূক্ষ্ম গণনা এবং জটিল নকশার জন্য পরিচিত, যেখানে রঙিন সুতা ব্যবহার করে অতিরিক্ত পাড় ডিজাইন করা হয়। এই শাড়িগুলো জামদানি সুতির শাড়ির একটি সরলীকৃত সংস্করণ, যার জমিনে আছে স্বল্প কিন্তু দৃষ্টিনন্দন নকশা। বাংলাদেশ থেকে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বিশ্বব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছে।

তবে, টাঙ্গাইল শাড়ির নামে আন্তর্জাতিক স্তরে পশ্চিমবঙ্গের জিআই পেটেন্ট নিবন্ধিত হওয়ায় গল্পে এখন একটি মোড় রয়েছে। ফলস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা টাঙ্গাইল শাড়িকে তাদের স্বতন্ত্র এবং মূল্যবান পণ্য হিসাবে প্রচার করার চেষ্টা করছেন।

টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প বাংলাদেশের প্রাচীনতম কুটির শিল্পের একটি। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। যে জেলায় এটি উৎপাদিত হয় তার নামানুসারে, এই ঐতিহ্যবাহী শাড়িটি ১৯ শতকের শেষের দিকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে শুরু হয়। তথ্য-উপাত্ত বলছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী বসাক সম্প্রদায় ছিল টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি।

মূলত অভিবাসী তাঁতি অর্থাৎ বসাকরা ঐতিহ্যবাহী মসলিন তাঁতিদের বংশধর। তাদের একটি অংশ ঢাকার ধামরাই উপজেলার চৌহাট্টায় বসবাস করেন। ১৯ শতকে মসলিন কাপড়ের ঘাটতি এবং আরও অনুকূল জলবায়ুর সন্ধানের কারণে টাঙ্গাইলে চলে যান তাঁতিদের একাংশ। প্রাথমিকভাবে টিকে থাকার জন্য তারা প্যাটার্নবিহীন সরল বুনন কাপড় বুননে হাত দেন। উৎপাদনের জেলা অর্থাৎ টাঙ্গাইল নামে পরিচিত এ শাড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের কথা। ১৯০৬ সালে মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশি আন্দোলনের সময় এ তাঁত শিল্পের প্রসার হয়েছিল উল্লেখযোগ্য হারে।

১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ, বোনা কাপড়ে নকশা প্রবর্তন করা হয় এবং ১৯৩১-৩২ সালে, জ্যাকোয়ার্ড তাঁত শাড়ি উৎপাদনের জন্য একত্রিত হয়। অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত টাঙ্গাইলের বুনন শিল্প বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। দক্ষ তাঁতিরা, বিশেষ করে জেলার পাতিল ইউনিয়নের বসাক সম্প্রদায়ের, আসল এবং ঐতিহ্যবাহী উপায়ে শাড়ি তৈরি করে চলেছে। সপ্তাহে দুই দিন বাজিতপুর ও করটিয়া হাটে এসব শাড়ি বিক্রি হয়।

বৈচিত্র্যময় বুনন

"তাঁত" শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "টান্টু" থেকে এসেছে। এই শিল্প লাখ লাখ মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন ধরনের তাঁতের মধ্যে রয়েছে পিট লুম, খটখটি তাঁত, চিত্তরঞ্জন বা মিহি, জাপানি তাঁত, ফ্রেম তাঁত এবং কোমরের তাঁত।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে পিট লুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে বিখ্যাত মসলিন শাড়ি তৈরিতে এর ব্যবহার ছিল। ঐতিহ্যবাহী জামদানি এবং অন্যান্য শাড়ি এখনও এই পিট তাঁতে উৎপাদিত হয়। সময়ের সাথে সাথে, ফ্লাই শাটল, স্থানীয়ভাবে তাঁতিদের কাছে "মাকু" নামে পরিচিত, এই তাঁতে যুক্ত হয়েছিল।

টাঙ্গাইল শাড়ি, টাঙ্গাইলের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। মাকু ব্যবহার করে প্রতিটি সুতা খুব যত্ন সহকারে বোনা হয়।

কালের পরিক্রমায় শাড়িতে বৈচিত্র্যময় নকশার জন্য ডবি এবং জ্যাকার্ড মেশিনের ব্যবহার শুরু হয়। আর অধুনাকালে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বয়ন শিল্পের ডিজাইনিংয়ে কম্পিউটারের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

সবশেষ অবস্থা

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯২ সালে টাঙ্গাইল জেলায় এক লাখেরও বেশি তাঁতির বসবাস ছিল। এই শিল্পের নির্ভরশীল ছিলেন দেড় লাখেরও বেশি মানুষ। এই তাঁতিরা জেলার সদর, কালিহাতী, নাগরপুর ও বাসাইল উপজেলায় বসবাস করতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা সোয়া তিন লাখেরও বেশি। 

বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হওয়ার কারণে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। চাহিদাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এখানকার শাড়ির দাম ৩০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বলছেন তাঁতিরা। তবে তাঁত, সুঁতা, রং এবং অন্যান্য কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় টাঙ্গাইলের শাড়ি শিল্প সংকটের মধ্যে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

   

About

Popular Links

x