Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সিকিউএস-ইআরকি’র যৌথ গবেষণা

নির্বাচনে বেশিরভাগ গুজব ছড়িয়েছে ইসি-পুলিশ-সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে

  • আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ায় ভিডিওতে গুজব ছড়ালে তা দ্রুত ছড়ায়, আয়ও বাড়ে বেশি
  • ৬৭% ভুয়া সংবাদের লিংকের থাম্বনেলে চটকদার ছবি দিয়ে ও বিকৃত ভিডিও দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:০২ পিএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক হারে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। অত্যাধুনিক উপায়ে ছড়ানো এসব তথ্য প্রভাব ফেলেছে নির্বাচনি কর্মকাণ্ডেও।  শুধু তাই নয়, ছড়ানো হয়েছে ঘৃণামূলক বক্তব্যও। কোথাও কোথাও ডিপফেকের সাহায্যও নেওয়া হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়াতে লেখার চেয়ে ভিডিও কন্টেন্টের ব্যবহার ছিল বেশি। তবে অন্যবারের তুলনায় সংঘাতময় বক্তব্য কম ছড়ানো হয়েছে এবারের নির্বাচনে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড কোয়ালিটেটিভ স্টাডিজ (সিকিউএস) এবং বিনোদনভিত্তিক ওয়েবসাইট ইয়ার্কি’র (eArki) যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।    

সিকিউএস ওয়েবসাইটে রবিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত ৭২% ভুল তথ্য ছড়ায় ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে। ১৪% ছবির মাধ্যমে বিশেষত ফটো কার্ড তৈরি করে। ১২.১% লিখিত বা প্রবন্ধ আকারে। আর ১.৯% ডিপফেক, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো কন্টেন্টের মাধ্যমে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৬৫% কুতথ্য (ডিজইনফরমেশন) মানহানি ও প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশে ব্যবহৃত হয়েছে (এর মধ্যে ৩২.৫% সরাসরি মানহানিকর, ৩২.৫% হস্তক্ষেপ বা প্রভাব বিস্তারকারী)। অভ্যন্তরীণ কলহ তৈরি করে এমন কন্টেন্টের ১২.৭%। ৮.৩% সংঘাত উসকে দেয় এমন। বাকি ৭% ছিল ভিত্তিহীন বা বাস্তবসম্মত নয় এমন প্রতিবাদী কর্মসূচি।

সরকারি সংস্থা ও রাজনৈতিক দল ছিল লক্ষ্যবস্তু

এসব কন্টেন্টের ৪৩.৩% মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষত নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে বিরুদ্ধে। বাকি কন্টেন্টগুলোর ২৪.৮% আওয়ামী লীগ বিরোধী, ২২.৩% দেশে ক্রিয়াশীল বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে। সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ৫.১% কন্টেন্টে।  

গবেষণার আওতায় আসা ভুয়া কন্টেন্টগুলোর ৪৪% কন্টেন্ট ছড়িয়েছে ভুয়া সংবাদ মাধ্যমের পেজে, যেগুলো মূলত ফেসবুকে। ৩২.৪% ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া ১.৫% ভিত্তিহীন কন্টেন্ট এসেছে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলো থেকে।

গবেষণা বলছে, গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হচ্ছে, আকর্ষণীয় থাম্বনেল। ৬৭% ভুয়া সংবাদের লিংকের থাম্বনেলে চটকদার ছবি দিয়ে ও বিকৃত ভিডিও দিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। এতে পাঠক-দর্শকদের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে নির্বাচনের দিন অর্থাৎ ৭ জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত গবেষণাটি চলে। উল্লিখিত সময়ে গবেষকরা ২০০ যাচাই করা সংবাদ ও ১৫৭ দুর্লভ কন্টেন্টের ওপর গবেষণাটি করেন। এতে এএফপি, বুম বাংলাদেশ, রিউমার স্ক্যানার ও ফ্যাক্ট ওয়াচের যাচাই করা কন্টেন্টগুলো স্থান পায়।

এআই নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়

গবেষণা দলের প্রধান ও সিকিউএসের পরিচালক দীন মোহাম্মদ সুমন রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এইবারের নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম গুজব ছড়িয়েছে। সংঘাত কম হয়েছে। কমিউনাল ভায়োলেন্সে সৃষ্টি হয়, এমন কন্টেন্ট চোখে পড়েনি সেরকম। এর কারণ, নির্বাচন নিয়ে মানুষের খুব বেশি টেনশন ছিল না। অনেকটা প্রেডিক্টেবল রেজাল্ট ছিল। মানুষের উৎসাহ ছিল কম। যখন কমিউনিটি টেনশন কম হয়, তখন গুজব কম ছড়ায়।”

দীন মোহাম্মদের দাবি, নির্বাচনে ভায়োলেন্স না ছড়ালেও মানহানি ও হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটেছে বেশি। ফলে, সেদিক থেকে এটি একটি শঙ্কা। এই নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যাপক অপব্যবহারের শঙ্কা ছিল। কিন্তু সেই পরিমাণে হয়নি। শান্তি-সম্প্রীতি অপ্রত্যাশিত মাত্রায় নষ্ট হয়নি।

গবেষণা দলের সদস্য শুভাশিষ দাস রায় দীপ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন,  “ভিডিওতে মানুষের মনোযোগ অনেক বেশি থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ভিডিও কন্টেন্ট বেশি সংযোগ তৈরি করে মানুষের সঙ্গে। ফলে অন্য ফর্মের কন্টেন্ট থেকে ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও অনেকেই ইউটিউব থেকে সরাসরি ভিডিও ডাউনলোড করে কম পরিশ্রমে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিতে পারে। আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ায় ভিডিওতে গুজব ছড়ালে তা দ্রুত ছড়ায়, আয়ও বাড়ে বেশি।”

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাঈদ আল-জামান বলেন, “অন্যান্য কন্টেন্টের চাইতে ভিডিও কন্টেন্ট থেকে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে এর চাহিদা এবং উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যার ফলে ভিডিও-ভিত্তিক বিভ্রান্তিকর তথ্যও অন্যান্য কন্টেন্টের চাইতে ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “এবারের নির্বাচনে হয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কম হয়েছে, তবে সামনের দিনগুলোতে এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা করতে যাচ্ছে। মূলত ডিপফেকের মতো ভিজ্যুয়াল ফরম্যাটে রাজনৈতিক বিভ্রান্তিকর তথ্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য একটি নতুন উদ্বেগ তৈরি করবে।”

রাজনৈতিক বিভ্রান্তিকর তথ্যের দুটি মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বিরোধীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করা অথবা নিজের দলের গুণগান করা। উল্লিখিত গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতাকেই নির্দেশ করে বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড শান্তনু মজুমদার বলেন, “নির্বাচনকেন্দ্রিক কুতথ্য সমাজে আগে থেকেই ছিল। ফেসবুকের মতো মাধ্যম আসার পর সেটা যেন জলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের সময় পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে কুতথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।”

শান্তনু মজুমদার মনে করেন, কুতথ্য ছড়ানো থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কমানো সম্ভব। তার মতে, দরকার সচেতনতা তৈরি ও মানুষের আচরণগত পরিবর্তন, যাতে ফেসবুকে কিছু দেখলেই তারা বিশ্বাস না করেন। ভোট এবং ভোটাধিকার, তাদের নাগরিক দায়িত্বও- এই সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

   

About

Popular Links

x