জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) হিসেবে টাঙ্গাইল শাড়ির নিবন্ধন নিয়ে চলমান বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলাদেশের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে ভারতের আদালতে মামলা করা। ভারতের নিজস্ব জিআই আইনে সেই মামলা করার সুযোগ আছে।”
মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগ্য আইনজীবী নিয়োগের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, “দেশের বৌদ্ধিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত টাস্কফোর্স এমন পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারে যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি না হয়।”
শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার ধানমন্ডিতে “টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি: প্রক্রিয়া, পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের করণীয়” শীর্ষক সভায় এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ভারতের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্প্রতি “বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ি” বা “টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল” নামে একটি শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা হয়।
এদিকে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে মনোনীত করে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নীতের কারণে স্থানীয় উৎপাদকদের স্বার্থ ও অর্থনীতির সুরক্ষার দিকে মনোযোগ দিয়ে দেশের বৌদ্ধিক সম্পত্তির সমস্যা মোকাবেলার জন্য একটি “মাল্টিডিসিপ্লিনারি টাস্কফোর্স” গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
২১ জানুয়ারি ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় পণ্যটিকে জিআই স্বীকৃতি দেয়। ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে সেটি নিয়ে পোস্ট করা হয়। পোস্টে বলা হয়, “টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।”
দেবপ্রিয় বলেন, “টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদনের সময় ভারত তথ্যের ভুল উপস্থাপন ও অপব্যবহার করেছে।”
তিনি বলেন, “ভৌগলিক উৎসের গুণমানকে ভৌগলিক দক্ষতার স্থানান্তর দিয়ে বিচার করা যায় না। টাঙ্গাইলে অনেক মুসলিম তাঁতি শাড়িতে কাজ করে। ভারত তথ্যের অপব্যবহার ও ভুল উপস্থাপন করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের নীতিনির্ধারকরা নীতি প্রণয়নে সুশীল সমাজ, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করেন না।”
তিনি বলেন, “আমলারা সবসময় সঠিক আলোচনা এবং ডকুমেন্টেশন ছাড়াই নীতি প্রণয়নে 'প্রো ফর্মা অনুশীলন' করে, তাই গুণমান পড়ে যায়।”
টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জিআই নিবন্ধন করার মাধ্যমে, ভারত “ফ্রি রাইড-এর প্রতি ঝোঁক প্রদর্শন করেছে। যা টাঙ্গাইল শাড়ির বাংলাদেশি উত্পাদকদের জন্য অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া পরিমাপের নৈতিক সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাংলাদেশের টাঙ্গাইল শাড়ির বাজার বিশ্বব্যাপী, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান এমনকি ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিস্তৃত।
বাংলাদেশ প্রতি সপ্তাহে ভারতে প্রায় ৫০,০০০ শাড়ি রপ্তানি করে। তার মতে, “ভারতের কাছে এখন বাংলাদেশের টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্যকে পুঁজি করার সুযোগ রয়েছে, যা ২৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “টাঙ্গাইল শাড়ি ছাড়াও ভারত বাংলাদেশি জিআই পণ্য ‘ঢাকাই মসলিন’-এর জন্য ‘বেঙ্গল মসলিন’ হিসেবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।”
তিনি মসলিন ইস্যুতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য দিল্লিতে বাংলাদেশি হাইকমিশন ও কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় আদালতে মামলা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশের জিআই হিসাবে ২১টি পণ্য নিবন্ধিত হয়েছে।
তিনি সরকারকে ক্রমাগত অন্যান্য দেশের জিআই জার্নাল, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ভাগ করা সম্পদের বিষয়ে নজরদারি করার আহ্বান জানান।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ডব্লিউটিওতে দেশগুলো তাদের প্রাপ্য পায় না, কিন্তু তারা যা আলোচনা করে তা পায়।”
তিনি এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি প্রক্রিয়া ও আলোচনার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।



