Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভবনে মৃত্যুঝুঁকি ও দায় এড়ানোর যত কর্তৃপক্ষ

  • দুর্ঘটনার পরে সাময়িক তৎপরতা দেখা যায়
  • সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ নেই
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৪, ০৬:০৬ পিএম

রাজধানীর ভবনগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশনসহ আরও কয়েকটি সরকারি সংস্থা। এর পরেও মাঝে মধ্যেই শোনা যায় ভবনে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার খবর। এসব ঘটনায় মৃত্যুও হয় বহু মানুষের। সর্বশেষ বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবfরের মতো পুলিশও হোটেল-রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে।

গত ১৪ বছরে ঢাকার কমপক্ষে ১০টি বড় ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটেছে। নীমতলী, চুড়িহাট্টা ও বনানীর এফআর টাওয়ারের পর বেইলি রোড আরও একটি ট্র্যাজেডি যোগ করল। এই চারটি ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২৬৭ জনের। এছাড়া গত কয়েক বছরে ঢাকায় বঙ্গবাজার, নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি বড় আগুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পরে অনেক কথা হয়, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। দায়ীদেরও বিচারের আওতায় আনার নজির কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ বিধি মেনে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে সাত-আটটি সংস্থা নিয়োজিত রয়েছে। তবে সংস্থাগুলো যে যার মতো কাজ করছে। সমন্বিতভাবে কাজ না করতে পারলে তাদের কর্মকাণ্ড ফলপ্রসু হবে না। ফলে এসব অনিয়মও পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না। এর পাশাপাশি ভবন মালিক ও ভেভেলপারদের দায় দেখছেন তারা।

জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রথম তিনদিনের অভিযানে ১,১৩২টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়েছে। আটক করেছে ৮৭২ জন কর্মচারীকে। একই সঙ্গে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস এবং সিটি করপোরেশনও অভিযান চালাচ্ছে। তারা ভবনের নকশার ব্যত্যয়, সেফটি ও সিকিউরিটির ব্যবস্থা, ভবনের শর্ত, ব্যবসার লাইসেন্সের মতো বিষয়গুলো দেখছে।

এ বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব জানান, “ঢাকার ভবনগুলো দেখার জন্য সাত-আট ধরনের কর্তৃপক্ষ আছে। তার মধ্যে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, কলকারাখানা অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ রয়েছে। তারা যার যার মতো কাজ করে। এই বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ না করে আলাদা আলাদা কাজ করায় আসলে কোনো ফল হয় না। উল্টো এর সুযোগ নিয়ে অসাধু কর্মকর্তারা লাভবান হয়।”

তবে এর বাইরেও ভবন নির্মাণ করতে গেলে সিভিল অ্যাভিয়েশন ও ট্রাফিক পুলিশের অনুমোদন লাগে বলে জানিয়েছে রাজউক।

পুলিশের অভিযানের ব্যাপারে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, “আমাদের অভিযান মূলত কোনো ভবনে প্রাণহানিকর বা ক্ষতিকর কিছু আছে কি-না তার জন্য। আইনে আমাদের সেটা দেখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।”

অভিযান চালিয়ে গুলশানের সুলতানস্ ডাইন বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। তারা বলেছে, শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা পরিচালনা করতো। আর কোনো ধরনের অনুমোদন ছিল না।

এ নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিবের প্রশ্ন, “তাহলে উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছিল কীভাবে?”

বেইলি রোডের আগুনের পর যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো আবাসিক এবং আবাসিক কাম অফিস ভবনের অনুমতি নিয়ে ভবন তুলে তাতে হোটেল-রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করা। ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ অনেক এলাকায়ই এখন আবাসিক ভবনে হোটেল রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসায় সাম্প্রতিক এই অভিযানের কারণে অনেকটা ভাটা পড়েছে। কোনোটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ অভিযান এড়াতে সংস্কার কাজ চলছে বলে ব্যানার টানিয়ে নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, “আমরা তো সব ধরনের লাইসেন্স নিয়েছি। সিটি করপোরেশন আমাদের ব্যবসার অনুমোদন দিয়েছে। সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছি নিয়মিত। ভবন মালিক আমাদের রেস্টুরেন্টের জন্য ভাড়া দিয়েছেন। তাহলে আমাদের দায় কোথায়? আমরা তো বিনিয়োগ করেছি।”

তিনি বলেন, “নানা ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স আমাদের নিতে হয়। এর জন্য হয়রানিও করা হয়। আমাদের তাদের সঙ্গে আর্থিক ডিলও করতে হয়।”

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগে তিনবার অগ্নি নিরাপত্তার জন্য নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। রাজউক ২০১৯ সালে একবার অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলেছিল, জরিমানাও করেছিল। তারপর ভবনটিতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা চলছিল। রাজউক এখন বলছে, ওই ভবনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার অনুমোদন নেই। তবে সেটার জন্য কিন্তু রাজউক বা কোনো কর্তৃপক্ষই তাদের নোটিশ দেয়নি। ধানমন্ডির “গাউছিয়া টুইন পিক” নামের বহুতল ভবনের স্থপতি নিজেই ফায়ার সার্ভিসে ওই ভবনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বন্ধের আবেদন করেছিলেন। কারণ, ভবনটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য অনুমোদিত নয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন বেইলি রোডের আগুনের পর ওই ভবনের ১২টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অবশ্য দাবি করছে অগ্নি নিরাপত্তার জন্য নোটিশ দেওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু তাদের করার থাকে না। তারা কখনো কখনো “ঝুঁকিপূর্ণ” ভবনে ব্যানার টানিয়ে দিয়ে আসেন। কিন্তু তারা চলে আসার পর তা ছিঁড়ে ফেলে ভবনের লোকজন। তবে আইনে তাদের মেবাইল কোর্ট পরিচালনা ও মামলা দুইটিরই ক্ষমতা দেওয়া আছে। তারা তা প্রয়োগ করে না।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আমরা নোটিশের পর মামলা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারি। তবে মামলা করে তেমন ফল হয় না। ২০১৪ সালের ফায়ার বিধিমালা স্থগিত থাকার ফলে মামলা কাজে আসে না। আর আমাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় মোবাইল কোর্ট পারিচালনাও কঠিন।”

ঢাকার কতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ?

২০২২ ফায়ার সার্ভিস ঢাকার ১,১৬২টি ভবন পরিদর্শন করে। এরমধ্যে ৬৩৫টি ভবনকে তারা আগুনের ঝুঁকিতে থাকা চিহ্নিত করে নোটিশ দেয়। তার মধ্যে আবার ১৩৬টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। মোট ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ৬৩৪টি; অর্থাৎ ৫৪.৬৭%।

২০১৯ সালে ফায়ার সার্ভিস ঢাকায় একটি জরিপ করে। তাতে দেখা যায়, ঢাকার ৩,৭৭২টি প্রতিষ্ঠান আগুনের ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে ১,৩০০ শপিংমল, মার্কেট ও বিপনি-বিতান। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৬১টি, ব্যাংক ৬৪, হাসপাতাল ৪২২, আবাসিক হোটেল ৩১৮ এবং ২৪টি গণমাধ্যমের ভবন আগুনের ঝুঁকিতে আছে।

রাজউকের হিসাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় একতলার চেয়ে বেশি উঁচু ভবন আছে পাঁচ লাখ ১৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৭৭% ভবন শর্তের বাইরে চলে গেছে। তারা আবাসিককে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছে। অথবা, ভবনে নিরাপত্তায় নানা ত্রুটি আছে।

২০১৯ সালে এফআর টাওয়ারে আগুনের পর রাজউক ১,৮০০ বহুতল ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। আর সিদ্দিক বাজারের আগুনের পর বেজমেন্টে দাহ্য পদার্থ, ভবনে অনুমোদন ছাড়া রেস্টুরেন্ট আছে এরকম ১,৮০০ ভবন চিহ্নিত করে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আইনে আমাদের ক্ষমতা আছে ওই ধরনের ভবন আমরা সিলগালা করে দিতে পারি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড দিতে পারি। মোবাইল কোর্ট আর্থিক জরিমানাসহ সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড দিতে পারে।”

রাজউকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ

অভিযোগ আছে নানা ধরনের অবৈধ এবং ত্রুটিপূর্ণ ভবনকে “বৈধতা” দিয়ে রেখেছে রাজউকের এক শ্রেণির কর্মকর্তা। অবৈধ কাজের অনুমোদনও তারাই অর্থের বিনিময়ে দেয়। তারা এজন্য আইনের নানা ফাঁক ব্যবহার করে। যেমন, ফায়ার সার্ভিস আইনে ছয় তলার ওপরে ভবনকে বহুতল বলা হয়। সেখানে পুরো ফায়ার সেফটি লাগবে। রাজউক আইনে ১০ তলার বেশি হলে বহুতল। তখন সেখানে পুরো ফায়ার সেফটি লাগবে।

অসাধু কর্মকর্তাদের এই যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করেননি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমরা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিই। এফআর টাওয়ারে আগুনের পর আমরা ৬০ জন ইন্সপেক্টেরকে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় শাস্তি দিয়েছি। কয়েকজন ফৌজদারি মামলায় আসামিও হয়েছেন।”

স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, “ভবনে নানা ধরনের অনুমোদন এবং নিরাপত্তার বিষয় দেখার জন্য সরকারের ছয়টি মন্ত্রণালয়ের আটটি সংস্থা আছে। তারা কেউই দায়িত্ব পালন না করে চাঁদাবাজি করে। তারা বিভিন্ন ধরনের অনুমোদনের নামে ব্যবসা করে।”

৮৮% ভবন ‘অবৈধ’

ঢাকার ভবনগুলোর মধ্যে ৮৮% অবৈধ বলে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) সমীক্ষায় উঠে এসেছে। বাকি ১২% ভবন কোনো না কোনোভাবে ব্যত্যয় করেছে বলেও এতে বলা হয়েছে। রাজউক এলাকায় মাত্র ৫,৫০০ ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট আছে।

এ ব্যাপারে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, “ছয়টি মন্ত্রণালয়ের আটটি সংস্থারও দায় নিতে হবে। এর সঙ্গে আছে অর্থলোভী ভবন মালিক ও ডেভেলপার। এই সবাই মিলে টাইম বোমার মতো মৃত্যুকূপ তৈরি করেছে।”

এর জবাবে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান বে আইল্যান্ড’র ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) শওকত হায়দার বলেন, “আমাদের দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু রাজউকসহ আর যারা এর দায়িত্বে আছে, তাদের কাছে সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলেও অনুমোদন পাওয়া যায় না। ফলে ওইসব সংস্থাকে আমাদের বিনিয়োগের বড় একটি অংশ দিতে হয়, যা আমাদের নির্মাণের মান খারাপ করে।”

   

About

Popular Links

x